For English Version
রবিবার, ২৫ জুলাই, ২০২১, রেজি: নং- ০৬
Advance Search
হোম অনলাইন স্পেশাল

চিকিৎসক-সরঞ্জাম সংকটে স্বাস্থ্য সেবা ব্যাহত

Published : Friday, 16 July, 2021 at 12:58 PM Count : 140
তৌহিদুল ইসলাম তালুকদার লায়নর

স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নের জন্য জয়পুরহাটেকালাই উপজেলা ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ২০১৫ সালে প্রথম স্থান। ২০১৮ সালে পঞ্চম স্থান ও ২০১৯ দ্বিতীয় স্থান পেয়ে জাতীয় পুরস্কার পায়। 

এছাড়াও, ২০২০ সাল থেকে প্রতি মাসে বিভাগ ও জেলার প্রথম স্থান অধিকার করে এই ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। 

কিন্তু জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে  প্রয়োজনীয় জনবল সংকট ও সরঞ্জামের অভাবে বর্তমানে স্বাস্থ্য সেবা চরম ব্যাহত হচ্ছে। 

এ উপজেলায় প্রায় দেড় লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার জন্য চিকিৎসকের ২২টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র আট জন। বাকি পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। তবে কর্মরত ওই আট জন চিকিৎসকের সঙ্গে পাঁচ জন সহকারী মেডিকেল অফিসাররা (স্যাকমো) তাদের নিজ নিজ দফতরের কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি আন্তঃবিভাগ, জরুরী বিভাগসহ অন্যান্য দফতরের সঙ্গে লিয়াজু মেনটেইনে সবসময় ব্যস্ত থাকেন। 

একইসঙ্গে প্রতিদিন শতাধিক রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীদের সামাল দিতে হিমশিম হচ্ছেন কর্মরত এসব চিকিৎসক ও সহকারী মেডিকেল অফিসাররা (স্যাকমো)। এতে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম। ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এলাকার চিকিৎসা সেবা নিতে আসা অসচ্ছল ও দরিদ্র রোগীরা। 

কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমনিতেই সমস্যার কোন শেষ নেই। তার উপর নতুন করে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেকে ‘করোনা ডেডিকেটেড’ ঘোষণা করায় বাড়তি যোগ হয়েছে করোনা রোগীর সংখ্যা। প্রতিদিন উপজেলায় লাফিয়ে বাড়ছে করোনা রোগীর সংখ্যা। পরিস্থিতি মোকাবিলার যে সক্ষমতা কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকার কথা তা বর্তমানে সংকটে। 

কারণ, প্রতিষ্ঠানসমূহে জনবল ও যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সামগ্রীর চরম সংকট রয়েছে। এই উপজেলায় দেড় লাখ অধিক মানুষের জন্য হাসপাতালে বেড রয়েছে মাত্র ৫০টি। ফলে এ অঞ্চলে মানুষ চরম আতঙ্ক ও শঙ্কার বিরাজ করছে। এই শঙ্কার মধ্যে প্রতিদিন বিভিন্ন গ্রামের মানুষের জ্বর, সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এলে তাদেরকে এন্টিজেন পরীক্ষায় পাঁচ থেকে ছয় জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হচ্ছে। বাড়ছে ভর্তি করোনা রোগীর সংখ্যাও।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৬ সালের ০৯ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৫০ শয্যা বিশিষ্ট কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন ঘোষণা করলেও চিকিৎসক ও সরঞ্জাম সংকট ছিল সেই সময়েও। বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাগজ কলমে পদের সংখ্যা ৯৯ জন থাকলেও কর্মরত আছেন ৬১ জন। আর শূন্য পদ রয়েছে ৩৮ জনের। জনবল সংকট থাকায় হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। 

এখানে বিশেষজ্ঞ ২২ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও পদায়ন না করায় বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র আট জন। 

শূন্য পদগুলো হচ্ছে- জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারী) একজন, মেডিসিনে একজন, গাইনি এন্ড অবসে একজন, এ্যানেসথেসিয়ায় একজন, চক্ষুতে একজন, ইএনটিতে একজন, কার্ডিওলজিতে একজন, অর্থোতে একজন, পেড্রিয়াটিকে একজন, চর্ম ও যৌনতে একজন, রেডিওলজিতে একজন, হোমিও প্যাথিক/আয়ুর্বেদিক মেডিকেল অফিসার একজন, আবাসিক মেডিকেল অফিসার একজন ও মেডিকেল অফিসার একজন। 

এছাড়াও, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর ২৩ পদ ফাঁকা রয়েছে। সেগুলো হলো-মিডওয়াইফারী একজন, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) একজন, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপী) একজন, পরিসংখ্যাবিদ একজন, প্রধান সহকারী কাম হিসাব রক্ষক একজন, প্রধান সহকরী একজন, হিসাব রক্ষক একজন, স্টোর কিপার একজন, ক্যাশিয়ার একজন, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর একজন, অফিস সহায়ক দু-জন, ওয়ার্ড বয় দু-জন, আয়া দু-জন, কুক/মশালর্চী একজন, সিকিউরিটি গার্ড দু-জন, ওটি এ্যাটেনডেন্ট/বয় একজন, মালী একজন ও সুইপার দু-জন। 

এসব পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় হিমশিম খাচ্ছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা আর ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা।

এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অডিটোরিয়াম (হলরুম) না থাকার কারণে সভা-সেমিনারসহ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালে আবাসিক ভবন সংকট থাকায় চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা বেশির ভাগই বাইরে থাকছেন। তাছাড়া প্রায় দেড় যুগ ধরে পুরাতন অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে চলছে জরুরী রোগী আনা নেওয়ার কাজ। জেনারেটর, সৌর বিদ্যুৎ অকেজো এবং এক্স-রে মেশিন সচল হলেও পুরোনো দিনের এক্স-রে মেশিন দিয়ে চলছে এক্স-রে। 

চিকিৎসক না থাকায় অপারেশনের যাবতীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি দীর্ঘ দিন ধরে পড়ে রয়েছে। ফলে এখানে কোন অপারেশনের কাজও হয় না। 

তাছাড়া ঘনবসতি ও আবাসিক এলাকায় এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, জয়পুরহাট-২ আসনে সংসদ সদস্য আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘করোনা ডেডিকেটেড’ ঘোষণা করার ফলে স্থানীয়রা করোনা ভাইরাস ছড়ানোর আশংকা করছেন। 

প্রতিদিন করোনা রোগী বেড়ে যাওয়ার কারণে চিকিৎসকদের সুরক্ষা জন্য পিপিই (পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট), সার্জিক্যাল মাস্ক ও গ্লাভস সংকট রয়েছে। ফলে আতঙ্কিত হয়ে চিকিৎসক-নার্সরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা করোনা রোগী ও ভর্তি থাকা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে স্বস্তি বোধ করছেন না। 

বর্তমানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগটি প্রায় চারশ গজ দূরে অবস্থিত কালাই এমইউ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে প্রতিদিন বহির্বিভাগে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরত চিকিৎসক ও সহকারী মেডিকেল অফিসাররা (স্যাকমো)।

সাধারণ রোগীদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপযুক্ত সেবা না পেয়ে সামান্য সমস্যাতেই রোগীদের জয়পুরহাট সরকারি আধুনিক হাসপাতাল অথবা বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হচ্ছে। ফলে কালাইয়ের সাধারণ রোগীরা জেলা শহরসহ বিভিন্ন ক্লিনিক ও প্রাইভেট চিকিৎসা কেন্দ্র নির্ভর হয়ে পড়েছেন। এতে করে হতদরিদ্র রোগীদের ভোগান্তির সীমা নেই। অনেক সময় আবার রোগীরা এলাকার হাতুরে চিকিৎসকদের খপ্পরেও পড়েন। 

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা উপজেলার তেলিহার গ্রামের পারুল বেগুম (৫৫) বলেন, কয়েক দিন যাবৎ শরীর খুব দুর্বল, কিছু খেতে পাড়ছি না। কিছু খেলেই বমি হচ্ছে। তাই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছিলাম ভর্তি হওয়ার জন্য। কিন্তু করোনা রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছে বলে আমি ভর্তি হতে পারলাম না। 

উপজেলার মাত্রাই গ্রামের আসুদা খাতুন (২৮) বলেন, শুনলাম অনেক দিন ধরে এখানে গাইনী চিকিৎসক নেই। তাই ফিরে যাচ্ছি। আমি গরীব মানুষ কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। আমাকে জরুরী ভিত্তিতে গাইনী চিকিৎসক দেখাতে হবে। এখন কোন উপায় নেই, ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবা নিতে হবে।

উপজেলার রাগোতপুর গ্রামের তাজুল ইসলাম (৩৭) অভিযোগ করে বলেন, ধানের কাজ করার সময় আমার কোমড়ে ব্যথা পেয়েছিলাম। সেই ব্যথা এখন আরও বেশি হচ্ছে। তাই এখানে এলাম। বহির্বিভাগে কর্তব্যরত এক চিকিৎসক বললেন এখানে চিকিৎসা হবে না জয়পুরহাট সরকারি আধুনিক হাসপাতালে যেতে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকজন মেডিকেল অফিসার এসব সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নূর আসাদ উজ-জামান বলেন, এখানে জুনিয়র কনসালটেন্ট ও মেডিকেল অফিসারের পদ কম থাকলেও সামর্থ্য অনুযায়ী রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিকে করোনা ডেডিকেটেড ঘোষণার ফলে এলাকার করোনা রোগীদের সেবাও দেওয়া হচ্ছে। 
 
-এমএ


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60; Online: 9513959; Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft