For English Version
সোমবার, ২১ জুন, ২০২১, রেজি: নং- ০৬
Advance Search
হোম অনলাইন স্পেশাল

দেশের সবচেয়ে বড় আমের বাজার হতে পারে নওগাঁ!

Published : Sunday, 6 June, 2021 at 12:32 PM Count : 142
আব্দুর রউফ রিপন

উত্তরের খাদ্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা নওগাঁ। মূলত ধান ও চাল উৎপাদনের জন্য নওগাঁ জেলা বিখ্যাত হলেও গত কয়েক বছর যাবত সুমিষ্ট আম উৎপাদনেও দেশ সেরার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এই জেলা। 

বর্তমানে আমের দ্বিতীয় রাজ্য হিসেবে সুনাম কুড়িয়ে আসছে নওগাঁ। ইতিমধ্যেই বাজারে আসতে শুরু করেছে নওগাঁর সুমিষ্ট আম। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা নওগাঁর সুমিষ্ট আমকে রাজশাহী কিংবা চাপাইয়ের নাম ভাঙ্গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এমনকি বিদেশেও চালান করে প্রতারণা করে আসছেন। 

এই জেলাতে যেসব শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে তার অধিকাংশই কৃষিভিত্তিক। কৃষিই নওগাঁর অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মূল চাবিকাঠি। কাটারিভোগ, কালোজিরা, জিরাশাইল, মিনিকেট চালসহ উন্নত মানের চালের জন্য এই জেলা বিশেষ ভাবে পরিচিত। এছাড়া ধান চাষ নির্ভর এই জেলা দেশের সিংহভাগ চালের জোগান দেয়। 

কিন্তু অল্প দিনেই ধানের এই রাজ্যে ঘটেছে সুমিষ্ট আম চাষের বিপ্লব। গত ১০ বছরে ধানের পাশাপাশি আম চাষাবাদের ফলে পাল্টে গেছে এই এলাকার চিত্র। ভারতীয় সীমান্তবর্তী পোরশা, সাপাহার, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা, ধামইরহাট উপজেলাতে বাণিজ্যিক ভাবে গড়ে উঠেছে শত শত বিঘা জমিতে আমের বাগান।

এছাড়াও জেলা সদর, বদলগাছী, মান্দাসহ অন্যান্য উপজেলাতেও গড়ে উঠছে আমের বাগান। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আমের সম্ভাব্য চাষ হয়েছে ২৫ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে। জেলায় আম্রপালি ৭৬ শতাংশ, বারি-৪ আম ছয় শতাংশ, আশ্বিনা সাত শতাংশ, ফজলি তিন শতাংশ, ল্যাংড়া তিন শতাংশ, ক্ষিরসাপাত দুই শতাংশ, গৌড়মতি এক শতাংশ, কাটিমন এক শতাংশ ও অন্যান্য জাতের এক শতাংশ জমিতে আমের বাগান গড়ে উঠেছে।

আম চাষিদের দাবি, পূর্বে আম চাষে জেলার ভারত ঘেষা সীমান্তবর্তী উপজেলা পোরশা ও সাপাহার বেশি পরিচিত ছিল। যেদিকে দৃষ্টি যেতো শুধুই ধু ধু ফাঁকা মাঠই চোখে পড়তো। অন্যান্য আবাদের চেয়ে আম চাষ বেশি লাভজনক হওয়ার কারণে ২০০৯ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে ধান চাষের পাশাপাশি আম বাগান গড়ে উঠতে শুরু করে। এক সময় নওগাঁর এই অঞ্চলের মানুষরাও আম বলতে পার্শ্ববর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম খুঁজতো। অথচ কয়েক বছরের ব্যবধানে এখন নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটিতে জন্ম নেওয়া আম কিনতে দেশ-বিদেশের মানুষ আসে এই এলাকায়। 

সাপাহার উপজেলার প্রান্তিক আম চাষি নওশাদ আলী জানান, গত বছর দুই বছর বয়সের আম বাগান থেকে চার লাখ টাকার আম বিক্রি করেছি। এবার নতুন করে আবার ১৫ বিঘা জমি লিজ নিয়ে আম বাগান তৈরি করেছি। আল্লাহ'র রহমতে এবার ফল ভালো ধরেছে। গত বছর এক মণ আম ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক মণ ধানের দাম ওঠে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। সেখানে এক মণ আম হাজারের নিচে নেই। কমবেশি সব জায়গায় এখন আমের বাগান গড়ে উঠেছে। সারাদেশের মৌসুমী ব্যবসায়ীরা এসে আম বাগান কিনে নিচ্ছেন আর ফলনও হচ্ছে ব্যাপক। গত মৌসুমে আমের মণ চার হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। তাই সবাই এখন আমের দিকেই ঝুঁকছেন। নওগাঁয় প্রায় ছোট-বড় ২৫০টি আমের আড়ৎ রয়েছে। গত বছর এই আড়তগুলোর অধীনে কাজ করছেন প্রায় ১০ হাজার মৌসুমী শ্রমিক। একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করেছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফরিদ খান জানান, নওগাঁর অর্থনীতির চাকা বরেন্দ্র অঞ্চলের আমে ঘুরছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে প্রতিদিন শত শত ট্রাক আম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। গত মৌসুমে নওগাঁর আম চাষিরা প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার আম বিক্রি করেছেন। এতে চাষীদের ঘরে এসেছে স্বচ্ছলতা, তেমনি মৌসুমজুড়ে হয়েছে হাজারো মানুষের কাজের সুযোগ।

তিনি আরও বলেন, এক সময় যাদের কোন কাজ ছিল না, তারা এখন কেউ বাগান পাহারা দিচ্ছেন, কেউ বাগানের পরিচর্যা করছে। আবার কেউ ভ্যান-ট্রলি চালিয়ে আম পরিবহনের কাজ করছে। কেউ আড়ৎ খুলে বসছেন, কেউ প্যাকেটিংয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কুরিয়ার সার্ভিসগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। প্রতিদিন হাজার হাজার কেজি আম কুরিয়ারে করে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এছাড়া আম বাজারজাত করতে ধানের খড়, চটের বস্তা ও ঝুড়ির কদর বেড়ে গেছে কয়েক গুণ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বলেন, নওগাঁ একটি খাদ্য উদ্বৃত্ত এলাকা। বর্তমানে নওগাঁয় আম চাষ হচ্ছে বেশি। বিশেষ করে বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও শিক্ষিত বেকার যুবকরা জমি ইজারা নিয়ে এ অঞ্চলে আমের বাগান তৈরি করছেন। এ জেলায় আম্রপলি বা বারি-৩ জাতের আমের ফলন বেশি হচ্ছে। যে হারে দিন দিন নওগাঁয় আম চাষের আবাদ বাড়ছে, উৎপাদনের ধারা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখলে দেশের অর্থনীতিতে আম বিশেষ অবদান রাখবে। জেলায় অন্তত ৪৬ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে জেলায় দেশের সবচেয়ে বড় আমের বাজার গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জেলার সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হয় সাপাহার উপজেলায় এক লাখ ১৯ হাজার ১৬০ টন, পোরশায় এক লাখ ১৫ হাজার ১৯৯ টন, পত্নীতলায় এক লাখ ১১ হাজার টন। চলতি মৌসুমে ২৫০০ কোটি টাকার আম বিক্রি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়াও একই জমিতে ধান ও আম চাষ হচ্ছে। যার কারণে প্রতি বছরই আমের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সাপাহার আম আড়ৎ মালিক সমিতির আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা বলেন, গত ১০ বছরে সাপাহারে আম বাজার ঘিরে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা আম কিনতে আসেন। তাদের পছন্দমতো আড়তে অবস্থান করে ধিরস্থির ভাবে সরাসরি কৃষকের বাগান থেকে আম কিনতে পারেন। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আম চাষি রেদোয়ানুর রহমান মুন জানান, জেলার সাপাহার উপজেলায় আমের নতুন রাজধানী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বর্তমানে এখানকার চাষীরা আম চাষে এগিয়ে থাকলেও লাভের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছেন। কারণ এখানে আমের কোন সংরক্ষণাগার নেই। জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে আম্রপালি বাজারে উঠলেও তখন চাষীরা ভালো দাম পান না। যদিও জুলাই মাসের শেষে আমের দাম অনেক বেশি হয় বাজারে। তাই চাষীরা যদি এক-দেড় মাস আম সংরক্ষণ করতে পারতেন, তাহলে অনেক লাভবান হতেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সামছুল ওদাদুদ বলেন, নওগাঁর পোরশা, সাপাহার ও পত্নীতলা উপজেলায় বেশি আম বাগান গড়ে উঠেছে। বরেন্দ্র এলাকায় পানির পরিমাণ কম আবার সেচ-সুবিধাও নেই। তাই মাটির বৈশিষ্ট্যের কারণেই আমের প্রচুর ফলন হয়। এখন ফলনের পরিমাণে জেলার আম বাগানগুলোতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চেয়েও বেশি হচ্ছে। জেলায় নতুন নতুন বাগান হচ্ছে এবং ফলনও বাড়ছে। গত বছর জেলায় আম উৎপাদন হয়েছিল দুই লাখ ৭২ হাজার মেট্টিক টন তার তুলনায় চলতি বছর তিন লাখ ২০ হাজার মেট্টিক টন আম বাজারজাতের আশা করা হচ্ছে। জেলার প্রধান আম হচ্ছে সুমিষ্ট আম্রপালি। এই আমের ওপর ভিত্তি করেই নওগাঁ ব্যান্ডিং হয়েছে। আম্রপালি নামটি হাইব্রিড জাতের আম। উত্তর ভারতের হার্টথ্রব আম দুশেহেরি হলো এই আম্রপালির মা, আর দক্ষিণ ভারতের সুপার স্টার হিরো নিলম জাতের আম হলো এই আমের পিতা।

জেলা প্রশাসক মো. হারুন-অর-রশীদ বলেন, জেলায় বেড়েই চলেছে আমের বাগান। বর্তমানে নওগাঁ থেকে সীমিত পরিমাণে আম বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। তাছাড়া গত বছর থেকে বারি আম-৩ বা আম্রপালি বিখ্যাত কোম্পানি ওয়ালমার্টের চাহিদার তালিকায় রয়েছে। নওগাঁ থেকে আম আমদানিকারক দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, সুইডেন, সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান। রফতানিযোগ্য আমের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সঠিক ভাবে বাজারজাত করার সকল প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন সম্পন্ন করেছে। 

-এমএ


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60; Online: 9513959; Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft