For English Version
শনিবার, ০৮ মে, ২০২১, রেজি: নং- ০৬
Advance Search
হোম অনলাইন স্পেশাল

শীতলক্ষ্যা পাড়ে শোকের উপাখ্যান

Published : Monday, 5 April, 2021 at 9:32 PM Count : 667
রাজু আহমেদ

শীতলক্ষ্যায় সলিল সমাধি হওয়া ২৯ জনের স্বজনদের মুখেই ছিল নিদারুণ কাহিনী। কেউ আবার শোকের বাকরুদ্ধ হয়ে চোখের পানিতেই বয়ান করছিলেন অনেক কিছুরই। শোকে বিহবল এসব কাহিনী যেন লক্ষ্যাপাড়ে সৃষ্টি করেছিল এক আর্তনাদ আর হারানোর উপাখ্যান।

সব শেষ মাহিনের
লঞ্চডুবিতে কান্নাই যেন চিরসাথী হয়ে গেল ১৩ বছর বয়সী মাহিনের। নিজের বাবা আর মায়ের লাশ দেখেও সে দিকে যেন খেয়ালই ছিল না তার। খুঁজে ফিরছিল আদরের ছোট্ট বোন মানসুরাকে। শেষতক পরিবারের সকলের লাশ একসঙ্গে দেখে নির্বাক মাহিন কি বলবে তাও যেন বুঝে উঠতে পারছিলো না।

হঠাৎ ছোট্ট এই কিশোরের বুক ফাঁটা চিৎকারে শান্তনা দেয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন আশপাশের সবাই। লঞ্চডুবির এই ঘটনায় বাবা আনোয়ার শেখ (৩৫), মা মাকসুদা (৩০) ও আট বছর বয়সী ছোট বোন মানসুরাকে হারিয়েছে মাহিন। 

সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া মাহিন থাকত রাজধানীর শনিরআখড়ায়। আনোয়ার শেখ ছিলেন ক্ষুদ্র কাঁচামাল ব্যবসায়ী। কাঁদতে কাঁদতে মাহিন বলছিল, নানা বাড়ি যাচ্ছিলেন তারা। একদিন পরই ফেরার কথা ছিল বাবা-মায়ের। তারা ফিরলেন ঠিকই কিন্তু লাশ হয়ে।

এহন ঘর দিয়া কি করমু
লাশ উদ্ধার হয়েছে জানতে পেরে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন মধ্য বয়সী ট্রলার চালক সেলিম। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তার বাবা শামসুদ্দিন মুন্সি (৯০) ও মা রেহেনা (৭০)। মায়ের ভাঙা হাতের চিকিৎসা করানোর জন্য নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগে অবস্থিত হাড়ভাঙা চিকিৎসালয়ে এসেছিলেন। চিকিৎসা নেওয়ার পর মুন্সিগঞ্জের চরকিশোরগঞ্জ মোল্লাপাড়া এলাকায় বাড়িতে ফিরছিলেন। 

সেলিম বলেন, ‘আমার বাবার মতো ভালো মানুষ দ্বিতীয় কেউ ছিল না। সকলরে জিগাইলেই এই কথা কইবো। আমারে কইছিল, ঘর কইরা দিব। এহোন আমি ঘর দিয়া কি করমু? আমি তো এতিম হইয়া গেলা। ‘মা গো ,ও মা,,,তুমিও ছাইড়া গেলা’-এই বলেই ট্রলারের মধ্যেই গড়াগড়ি করে কাঁদছিলেন তিনি।

রাক্ষুসে জাহাজ মায়রে ডুবাইয়া মারলো
গলার টনসিলের চিকিৎসা করাতে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় মেয়ের বাড়িতে এসেছিলেন খাদিজা বেগম (৫০)। চিকিৎসা শেষে নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সিগঞ্জ হয়ে গ্রামের বাড়ি বরিশালের স্বরূপকাঠিতে ফেরার উদ্দেশ্যে সাবিত আল হাসান লঞ্চটিতে ওঠেন তিনি। তার মরদেহ সামনে রেখে কাঁদছিলেন মেয়ে নাজনীন। 

বলছিলেন, মায়ের পরনে বোরকা থাকলেও লাশের শরীরে বোরকা ছিল না। বাঁচার জন্যই হয়তো গায়ের বোরকা খুলে ফেলেছিলেন তিনি। ‘আমার মায় সাঁতার জানে তারপরও বাঁচতে পারলো না। রাক্ষুসে জাহাজ আমার মায়রে ডুবাইয়া মারলো। 

নীরবে কাঁদছেন বাড়ির সবাই  
লকডাউনের কারণে ঢাকার বাসা ছেড়ে মুন্সিগঞ্জ শহরে বাবার বাড়িতে যাচ্ছিলেন মুন্সিগঞ্জের দক্ষিণ কোটগাঁও এলাকার দুলু মিয়ার মেয়ে দোলা বেগম (৩৪)। বাড়িতে মেয়ে আকসার (৩) কে রেখে ১৫ বছরের ছেলে ইফাজকে সঙ্গে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ ঘাটে এসে লঞ্চে ওঠেন মুন্সিগঞ্জের উদ্দেশে। পথে শীতলক্ষ্যা নদীতে জাহাজের ধাক্কায় ডুবে যায় সাবিদ আল হাসান নামের লঞ্চটি। 

ছেলেকে বাঁচাতে হাত ধরেছিলেন বেশ কিছুক্ষণ। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয়নি। ইফাজকে নির্মাণাধীন ব্রিজের শ্রমিকরা উদ্ধার করলেও কয়েক ঘণ্টা পর দোলার মরদেহ উদ্ধার করে উদ্ধারকারীরা। শিশু আকসার মা হারানোর কষ্টটা বোঝার মতো বয়স তার হয়নি। তাই মায়ের কথা মনে পড়লেই কান্না করছে আর মাকে খুঁজছে। আর ছেলে ইফাজ তো চোখের সামনেই হারিয়ে যেতে দেখেছে তার মাকে। তাই এই কষ্ট কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সে।

ইফাজ জানায়, অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে রওয়ানা দিয়েছিল লঞ্চটি। তখন একজন ব্যক্তি প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে চালাচ্ছিল। যখন বড় জাহাজটি লঞ্চের কাছাকাছি আসে তখন সব যাত্রীরা চিৎকার করে জাহাজকে থামানোর জন্য বলছিল। কিন্তু তারা না থামিয়ে উপর দিয়ে চলে যায়। তখনও আমি আম্মুর হাত আর আম্মু আমার হাত শক্ত করে ধরেছিল। কিন্তু এরপর লঞ্চটি আমাদের সবার উপরে পড়ে যায়। তখন পানিতে ডুবে যাই। আশপাশের সবাইকে বলেছি আমার আম্মুকে খুঁজে দেওয়ার জন্য।

নাতির আমার কোলে খেলছিল
প্রত্যক্ষদর্শী ও লঞ্চের বেঁচে যাওয়া যাত্রী সাইফুল ইসলাম বলেন, কোলে কইরা (করে) লঞ্চের মধ্যে জানলার পাশে বইসা খেলতাছিলো নামার নাতী। কিন্তু লঞ্চ সৈয়দপুরে এলে একটা বড় জাহাজ আইয়া তিনটা ধাক্কা দেয়। পরে আমার নাতি জানি কই গেল গা। আর খুঁইজা পাই নাই। আমি আর কিছু চাই না। আমার নাতির লাশটা ফিরায়া দেন। 

এদিকে একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মুর্ছা যাচ্ছেন শিউলি বেগম। প্রলাপ বকছেন, আমার মানিক কই গেল গা। মানিকরে আমার কাছে দিয়া দাও।

-এমএ


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60; Online: 9513959; Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft