For English Version
শনিবার, ০৮ মে, ২০২১, রেজি: নং- ০৬
Advance Search
হোম অনলাইন স্পেশাল

কালো মুরগি এনে দিলো সেলিনার সংসারে আলো

Published : Wednesday, 31 March, 2021 at 2:31 PM Count : 331
তৌহিদুল ইসলাম তালুকদার লায়নর

বেশ কয়েক বছর আগে সেলিনার সংসার চলত অভাব অনটনে। এমন কি তিন বেলা ঠিকমত খাবারও জুটতো না তাদের। স্বামী রায়হান রাজমিস্ত্রির জোগালের কাজ করেন। দুই ছেলে-মেয়েসহ চার জনের সংসারের স্বামীর সামান্য মজুরিতে তাদের সংসার চলে না। 

পরিবারের আয় সামলাতে সেলিনা তার নিকটতম আত্মীয় থেকে কিছু টাকা ধার এনে পাকিস্তানী, ব্রয়লার ও লেয়ার জাতের মুরগির খামার গড়ে তুলেছিলেন। এতে লাভের মুখ যেমন দেখেছিলেন, তার পাশাপাশি লোকসানের পরিমাণও কম ছিল না। তাই সেগুলো বাদ দিয়ে প্রায় দুই বছর আগে স্থানীয় এক বেসরকারি এসো সংস্থা থেকে খোঁজ পান পুষ্টি, ঔষধি গুণসম্পন্ন ও লাভজনক কালো রঙের কাদাকনাথ মুরগির। এই মুরগির খামার দিয়ে বদলে দিয়েছে সেলিনার ভাগ্য।

ভারতের মধ্য প্রদেশের পুষ্টি, ঔষধি গুণসম্পন্ন ও লাভজনক মুরগি হিসেবে পরিচিত কাদাকনাথ খামার এখন জয়পুরহাটেকালাই উপজেলার কাশিপুর গ্রামের গৃহবধূ সেলিনার নিজ বাড়িতে। নিজ খামারে ইতিমধ্যে বাণিজ্যিক ভাবে মুরগি পালন শুরু করেছেন তিনি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখে যায়, গৃহবধূ সেলিনার নিজ বাড়িতে কাদাকনাথ মুরগির ব্যতিক্রমী খামার গড়ে তুলেছেন। ব্যতিক্রম এ কারণে যে, পোলট্রি খামারগুলোয় সাধারণত খাঁচায় মুরগি পালন করা হয়। কিন্তু সেলিনা মুরগি পালন করছেন উঠানে ও মাঠে ছেড়ে দিয়ে। তার বাড়িতে নানা জাতের মুরগি রয়েছে। তবে কালো মুরগিই আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু। যুগে যুগে কালোর কদর না থাকলেও কুচবরণ এই মুরগি এখন গুরুত্বের বিচারে সেলিনার কাছে বেশি কদর পাচ্ছে। কুচবরণ মুরগির  পালক, চামড়া, ঠোঁট, নখ, মাথার ঝুঁটি, জিব, হাড়, মাংস এমনকি নাড়িভুঁড়ি সবই কালো। 

মাংস সুস্বাদু, ঔষধি গুণসম্পন্ন এবং লাভজনক এ ভিন্ন জাতের মুরগির আদি ঠিকানা ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের কেমানি নামক এলাকার। সেখানে এটাকে বলা হয় ‘আয়্যাম কেমানি’। তবে ভারতের মধ্য প্রদেশে কাদাকনাথ মুরগি রয়েছে। সেখানে এই মুরগি ‘কালোমাসি’ নামে পরিচিত। 

শুধু মুরগি পালন নয়, এক দিনের বাচ্চা উৎপাদনও শুরু করেছেন এই নারী উদ্যোক্তা। তার খামারে বড় ও মাঝারি কাদাকনাথ মুরগি রয়েছে প্রায় ৭০টি। এর মধ্যে ২৫টি বড় কাদাকনাথ মুরগি রয়েছে। তার মধ্যে ৬টি মোরগ ও ১৯টি মুরগি রয়েছে। বর্তমান প্রতিটি মুরগি বছরে গড়ে ১৫০টি ডিম দিচ্ছে। তার নিজস্ব ইনকিউবেটরের মাধ্যমে প্রতি মাসে শত শত কাদাকনাথ মুরগি বাচ্চা উৎপাদন করছে। 

অন্যান্য পোল্ট্রি মুরগির মতোই ২১ থেকে ২২ দিনে ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদন করছেন সেলিনা। প্রতি মাসে প্রায় ৪শ বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০০টি বাচ্চা বিক্রি করেছেন তিনি। তার খামারে নতুন প্রজাতির মুরগি দেখতে প্রতিদিনই উৎসুক নারী-পুরুষের ভীড় করছেন।

গৃহবধূ সেলিনা বলেন, বর্তমানে পোল্ট্রি ব্যবসায় যে ধস নেমেছে তার মূল কারণগুলোর একটি হচ্ছে খাদ্য খরচ বেশি। পাকিস্তানী, ব্রয়লার ও লেয়ার জাতের মুরগির খামারে ব্যয়ের চেয়ে আয় অনেক কম। তাই মনে মনে ভাবছিলাম নতুন কিছু করবো। প্রায় দুই বছর আগে স্থানীয় এক বেসরকারি এসো সংস্থা থেকে খোঁজ পেলাম পুষ্টি, ঔষধি গুণসম্পন্ন ও লাভজনক কালো রঙের কাদাকনাথ মুরগির। সেই সংস্থা থেকে ২২ দিনের বয়সের কাদাকনাথের ৩০টি বাচ্চা নিয়ে পালন করলাম। এ মুরগির খাদ্য খরচ একেবারেই কম। এমনকি কাঁচা ঘাসও বেশ স্বচ্ছন্দে খেয়ে নেয়। এই মুরগি উঠানে, বাঁশের মাচায় ও মাঠে ছেড়ে দিয়ে পালন করছি। অন্য যেকোনো মুরগির চেয়ে এই মুরগি পালনে তেমন ঝামেলা নেই। এই মুরগির উৎপাদন ব্যয় অনেক কম। অল্প বিনিয়োগে স্বল্প সময়ে অধিক মুনাফা করা যায়। এই মুরগি রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাও অনেক বেশি।

তিনি বলেন, একটি পূর্ণ বয়স্ক কাদাকনাথ মোরগের ওজন হয় তিন থেকে সাড়ে তিন কেজি এবং মুরগির ওজন দুই থেকে আড়াই কেজি হয়ে থাকে। বড় মোরগের দাম প্রায় দু-হাজার টাকা এবং বড় মুরগির দাম প্রায় দেড় হাজার টাকা। এই মুরগি সৌখিন হিসেবেই মানুষ খায়। খাওয়ারের জন্য মানুষ মোরগ বেশি কেনেন। এই মুরগির মাংসে পুষ্টি উপাদান রয়েছে অনেক বেশি। ডিম ও  মাংস খেতে খুব সুস্বাদু এবং ঔষধি গুণসম্পন্ন। ছয় মাস বয়সে প্রতিটি মুরগি বছরে ১৩০ থেকে ১৫০টি ডিম পাড়ে। তবে এই মুরগি ডিমে তা দেয় না। বাচ্চা ফোটাতে দেশি মুরগির নিচে তা দেয়া হয়। কিংবা ইনকিউবেটরে কৃত্রিম ভাবে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটানো হয়। এক মাস বয়সের বাচ্চা ৩শ থেকে সাড়ে তিনশ টাকা দামে বাজারে বিক্রি হয়। বর্তমার বাজারে এই মুরগির বাচ্চার চাহিদার অনেক বেশি। বাচ্চা নিতে হলে মাস খানেক আগে অর্ডার দিতে হয়। আমার কাছ থেকে প্রায়ই বাচ্চা কেনে নিয়ে যায় অনেক খামারি। তারাও নতুন করে পালন করছেন। এই মুরগি পালন করে সংসারে আর্থিক স্বচ্ছতা এসেছে।

উদয়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ওয়াজেদ আলী মন্ডল দাদা বলেন, সরকারি নানা উদ্যোগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেসরকারি উদ্যোগে সাধারণ মানুষসহ গৃহবধূ সেলিনারমতো ভাগ্য পরিবর্তনের এমন চেষ্টা প্রশংসার দাবিদার। 

উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আবু তালেব বলেন, বিদেশী এই কাদাকনাথ বা কালো মুরগি পুষ্টিগুণ বিবেচনায় অন্য সব মুরগির চেয়ে এগিয়ে। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, যৌন দুর্বলতা এমনকি ক্যান্সারের মতো জটিল রোগে আক্রান্তদের জন্য কাদাকনাথ মুরগির মাংস এবং ডিম খুব উপকারী। এই মুরগির মাংসে কোলেস্টেরল কম থাকে। কাদাকনাথের মাংস ভিটামিন বি১, বি২, বি৬, বি১২, সি, ই, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ও এ্যামিনো এসিড সমৃদ্ধ। কালো মুরগির মাংস শিশুদের দৈহিক গঠনের জন্য অনেক উপকারী। 

তিনি আরও বলেন, অন্য সব মুরগির চেয়ে কাদাকনাথ মুরগির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি ফলে চিকিৎসা খরচও অনেক কম। নিয়মিত টিকা ব্যবহার করলে খামারিকে অন্য কোন ওষুদের জন্য বাড়তি ব্যয় করতে হবে না। কাদাকনাথ মুরগি পালনে স্বল্প ব্যয়, স্বল্প পরিশ্রম ও স্বল্প সময়ে অধিক আয় নিশ্চিত করা যায়। ফলে বাজারে এর চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। আর গৃহবধূ সেলিনা নিজ বাড়িতে কাদাকনাথ মুরগির খামার দিয়ে বড় একটি ভূমিকা রেখেছেন। এর ফলে তার দেখাদেখি এলাকায় নতুন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণে অবদান রাখার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

-এমএ


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60; Online: 9513959; Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft