For English Version
শনিবার, ০৬ মার্চ, ২০২১, রেজি: নং- ০৬
Advance Search
হোম মতামত

আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস ও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা

Published : Monday, 25 January, 2021 at 8:16 PM Count : 327

২৪ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস হলেও, এ বছর ২৫ তারিখকে শিক্ষা দিবস হিসেবে গ্রহণ করে বিভিন্ন কার্যক্রম ঘোষণা করেছে ইউনেস্কো। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২০২০ সালে পৃথিবীব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায়, এবছরের আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের প্রতিপাদ্য ঘোষণা করা হয়েছে " Recover and Revitalize Education for the COVID-19 generation " ক্ষতিগ্রস্থ শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার করার জন্য পৃথিবীব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি নেয়া হলেও, বাংলাদেশে এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।

শিক্ষা সংক্রান্ত দুইটি মন্ত্রণালয়, চারটি অধিদপ্তরসহ আনুষঙ্গিক কয়েক ডজন অফিস থাকলেও এই দিবসটিতে উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসূচি পূর্বে কখনো চোখে পড়েনি যা থেকে শিক্ষার গুরুত্ব জাতি জানতে পারবে বা দেশের একজন মানুষ বুঝতে পারবে ‘সমাজে শিক্ষার ভূমিকা’, এমন কোনো কর্মসূচি নজরে আসেনি যা থেকে অনুধাবন করা যাবে যে, শিক্ষাই উন্নয়নের মূলমন্ত্র। ২০২০ সাল ছিলো ছাত্র-ছাত্রী বা শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন জগৎ। সারাবছর পৃথিবীব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের টিকা আবিষ্কার হওয়ায় অন্ধকারে নিমজ্জিত শিক্ষা ব্যবস্থায় দূরে কোথাও আলোর শিখা দেখা যাচ্ছে। হয়তো খুব তাড়াতাড়ি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আবার আগের জায়গায় ফিরে আসতে পারবে। ছাত্র-ছাত্রী ফিরে যাবে তাদের স্বাভাবিক জীবনে।

উন্নত দেশসমূহ শিক্ষার ব্যয়কে বিনিয়োগ হিসেবে মনে করে। তাইতো তারা শিক্ষার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। ইউনেস্কো মোট বাজেটের সর্বনিম্ন ৬% শিক্ষায় বরাদ্দের প্রস্তাব করলেও কোন কোন দেশ শিক্ষার ক্ষেত্রে ১৩% পর্যন্ত বিনিয়োগ করে থাকে। সেখানে বাংলাদেশের বরাদ্দ ২ শতাংশ বা তারও নিচে। কিছু কিছু অনুন্নত দেশ বা উন্নয়নশীল দেশ তাদের শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষে তাদের বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ শিক্ষার ক্ষেত্রে দিয়ে থাকে। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে শিক্ষার ক্ষেত্রে বিনিয়োগে বাজেটের শতকরা হারের দিক হতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯১ দেশের মধ্যে ১৮৩, যখন শিক্ষায় বাংলাদেশের বরাদ্দ ২%। কিন্তু ২০১৯ সালে সেই পরিমাণ ছিলো ১.৩%। তাহলে বর্তমান অবস্থান কেমন হবে তা অনুমেয়। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার জন্য বিনিয়োগ দৃশ্যমান হয় না, বরং রাস্তাঘাট, কালবাট, ভবন বা সেতু নির্মাণ করলে তা দৃশ্যমান হয়। তাই বাংলাদেশে কোন সরকার কখনোই শিক্ষার বিনিয়োগে উৎসাহী হয়নি। সেজন্য এখানে ভবন নির্মাণ, রাস্তা নির্মাণ, ব্রিজ বা সেতু নির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়ে থাকে। আর সেকারণেই শিক্ষাব্যবস্থায় নেই কোনো গবেষণা, নেই প্রণোদনা।

অন্যদিকে আধুনিক শিক্ষার সাথে বাংলাদেশের শিক্ষার কোন মিল নেই। হ-য-ব-র-ল এই শিক্ষা ব্যবস্থায় বার বার অবস্থান পরিবর্তন করা হলেও গবেষণামূলক কোন শিক্ষা ব্যবস্থা দেশে চালু হয়নি কখনোই। গবেষণাবিহীন, মুখস্থ নির্ভর যে শিক্ষা পদ্ধতি চালু রয়েছে তা ব্রিটিশদের তৈরি করা ‘কেরানি তৈরি’ পদ্ধতি। বিভিন্ন সময়ে সিলেবাস বা কারিকুলাম পরিবর্তন করা হলেও সেগুলি ছিলো ‘টেস্ট কেস’। কোন গবেষণা ছাড়াই চালু হয়েছে, আবার কর্তৃপক্ষ পরিবর্তন হলেই তা বাতিল হয়ে নতুন কিছু হয়েছে। কিন্তু সবই হয়েছে ব্যক্তির ইচ্ছায়, গবেষণাবিহীনভাবে।

 ‘শিক্ষা’ শব্দটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হচ্ছে ‘শিক্ষক’। উপযুক্ত শিক্ষার জন্য দরকার মেধাবী শিক্ষক। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে দেশের শিক্ষকরা সমাজে খুবই অবহেলিত, অবহেলিত রাষ্ট্রের কাছেও। এদেশের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতার বস্তা মাথায় নিয়ে রাস্তা দিয়ে হেটে যায়- যার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবাই দেখতে পায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা বিতরণসহ অন্যান্য কার্যক্রম করতে গিয়ে গ্রামের মাতুব্বর দ্বারা অপমানিত হওয়ার খবর শুনতে পাই । উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলার ভাষা আমার নাই। শিক্ষাব্যবস্থার এই সেক্টর যেনো সব থেকে অবহেলিত। দেশে প্রায় এক লক্ষ দশ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল হাতেগোনা কয়েকটি। প্রায় ৯৩% শিক্ষার্থীকে পড়তে হয় বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। যেখানে শিক্ষক নিয়োগের নিয়ম সকলেরই জানা । অনিয়মই সেখানে একটি নিয়ম। নিয়োগ পদ্ধতি যা-ই হোক, সেই সকল শিক্ষকের নেই কোন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষক হয়ত কেবল এদেশেই আছে। ম্যানেজিং কমিটির নামে এলাকার অশিক্ষিত মাতুব্বরের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় স্কুল। এভাবেই চলছে মাধ্যমিকের শিক্ষা পদ্ধতি।

 শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি দেশের যেকোন নিয়োগ পদ্ধতি হতে নিকৃষ্টতর। যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তখন থেকে আজ পর্যন্ত কোনদিন শুনিনি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তদবির ছাড়া কেউ নিয়োগ পেয়েছেন, তাই তিনি যতই যোগ্যতাসম্পন্ন হোক না কেন। গত ২৫ বছরের মধ্যে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের কেউ তদবির ছাড়া নিয়োগ পেয়েছেন- এমন কথা কেউ বলতে পারবেন বলে আমি মনে করিনা, তাই তিনি যত মেধাবীই হোক না কেনো । তাহলে যিনি রাজনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেলেন তিনি কিভাবে অরাজনৈতিকভাবে শিক্ষাদান কার্যক্রম পরিচালনা করবেন!

শিক্ষা সেক্টরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হচ্ছে ‘ছাত্র রাজনীতি’। রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির এসব ছাত্রনেতারা এহেন কোন অপকর্ম নেই যা করে না। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, রাহাজানি, খুন, হত্যা, ধর্ষণ সকল অন্যায় কাজের সাথেই ছাত্রনেতাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ কে হবেন-তাও এখন ছাত্র নেতারা ঠিক করে দেয়। সকালবেলা উঠে ছাত্রনেতাদের কোন দাবিকে মিটাতে হবে -সেই চিন্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষকে রাতে ঘুমানোর আগে ঠিক করতে হয়।ফলে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাববার সময় তাঁদের নেই।

লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতির মত আরেক কালো অধ্যায় নির্লজ্জ্বতায় ভরা শিক্ষক রাজনীতি। রাজনৈতিক পরিচয়ে নিয়োগ পাওয়া এবং একই পথে ভালো পদে আহরণ বা পদোন্নতি লাভের আশায় শিক্ষকের মর্যাদা ধরে রাখতে পারছেন না অধিকাংশ শিক্ষক। শিক্ষাদান বা শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে না ভেবে, রাজনৈতিক চিন্তা মাথায় নিয়ে দলবাজি, তেলবাজি আর পেটবাজিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন অধিকাংশ শিক্ষক। যে দু’চার জন নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন ,তাঁরা অবহেলিত ও অপমানিত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। ফলে তাঁরাও দিবা নিদ্রায় শায়িত আছেন।

শিক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গঠন করা হয়েছিলো ‘শিক্ষা ক্যাডার’। কিন্তু শিক্ষা সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণী ঠিক করার কোনো স্থানেই তাঁদের রাখা হয়না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার লক্ষে সোনারবাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন শিক্ষককে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব করেছিলেন। ৭৫ এর ১৫ই আগস্টের পর সেই স্বপ্ন বিলীন হয়ে যায়। শিক্ষা আবার চলে যায় অশিক্ষকের হাতে। আজো সেই অবস্থার উত্তরণ হয়নি। শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ অফিস ‘শিক্ষা অধিদপ্তর’ হচ্ছে একটি পোস্ট অফিস, যার নেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোন ক্ষমতা । তারা কেবলমাত্র মন্ত্রণালয়ের হুকুম তামিল করে থাকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বারান্দায় প্রতিদিন শত শত মানুষকে হাটতে দেখা যায়, তাঁদের অধিকাংশই বদলির উদ্দেশ্যে।

অর্থাৎ শিক্ষা মন্ত্রণালয় সারাদিন ব্যস্ত বদলি নিয়ে, শিক্ষা বা শিক্ষার মান নিয়ে ভাববার সময় নেই। ফলাফলে দেখা যায়, স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পরে এসেও এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সেই কেরানির তৈরি করা শিক্ষাপদ্ধতিই রয়েছে। অর্থশালী ব্যক্তিরা তাঁদের সন্তানদেরকে দেশের বাইরে রেখে যুগোপযোগী শিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন, পাশাপাশি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা এই অদক্ষ, অপরিকল্পিত মুখস্ত নির্ভর শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে আটকে আছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তারা পাচ্ছে না প্রকৃত শিক্ষা। কারিগরি শিক্ষার পরিবর্তে এদেশে তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার উচ্চ শিক্ষিত বা সার্টিফিকেটধারী মানুষ । এদের মধ্যে বিরাট সংখ্যক মানুষ বেকার হয়ে অসহায় জীবন যাপন করছে, ফলে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে তারা হয়ে উঠছে অসহিষ্ণু।

 মানুষকে ‘মানব সম্পদে’ রূপান্তরিত করে ভারত-চীন সহ অন্যান্য অনেক দেশ অনেক সামনে এগিয়ে গেছে; কিন্তু আমরা আমাদের মানুষদেরকে মানুষই রেখেছি, সম্পদে পরিণত করতে পারিনি। এমনকি এদেশ থেকে যে সমস্ত শ্রমিক বিদেশে যায় তাঁরাও পুরোপুরি প্রশিক্ষণবিহীন । এসমস্ত শ্রমিকেরা দেশের বাইরে গিয়ে খুবই অমানবিক জীবন-যাপন করে থাকে। সমপরিমাণ যোগ্যতা নিয়ে অন্যান্য দেশ থেকে শ্রমিকরা গিয়ে অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে চাকরি করে।

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো যুগোপযোগী করা একান্ত অপরিহার্য। শিক্ষাকে আরো অগ্রাধিকার দিতে হবে। অধিক যোগ্য লোককে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, তাঁদেরকে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে মানুষকে মানব সম্পদে রূপান্তর করার লক্ষে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রকে সেই ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নতকরণের মাধ্যমে এদেশের মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ সঠিকভাবে প্রয়োগ করে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যুগোপযোগী হবে এবং সর্বসাধারণের জন্য সুফল বয়ে আনবে- আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসে সেই প্রত্যাশা রইলো।

মুহম্মদ মফিজুর রহমান
রিসার্চ ফেলো (পিএইচডি)উহান, চীন

এইচএস


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60; Online: 9513959 & 01552319639; Advertisemnet: 9513663
E-mail: info@dailyobserverbd.com, online@dailyobserverbd.com, news@dailyobserverbd.com, advertisement@dailyobserverbd.com,   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft