For English Version
বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২১, রেজি: নং- ০৬
Advance Search
হোম অনলাইন স্পেশাল

সিরাজগঞ্জে বাড়ছে কিশোর অপরাধ!

Published : Friday, 27 November, 2020 at 7:34 PM Count : 99
অশোক ব্যানার্জী

সিরাজগঞ্জে এ পর্যন্ত কোন কিশোর গ্যাংয়ের সন্ধান পায়নি জেলা পুলিশ। তবে কিশোর গ্যাংয়ের সন্ধান না পাওয়া গেলেও বিভিন্ন ধরনের অপরাধ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে জেলার শিশু-কিশোরদের মধ্যে। মাদক, জুয়া ও চুরি-ছিনতাই থেকে শুরুকরে খুন-ধর্ষণের মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে সিরাজগঞ্জের শিশু-কিশোরেরা। এ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাও একেবারে কম নয়। সিরাজগঞ্জে কিশোর গ্যাং যেন তৈরী হতে না পারে এবং কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রনে জেলা পুলিশ কঠোর নজরদারী রেখেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ বিভাগ। 

অভিভাবকদের অসচেতনা এবং নিয়ন্ত্রনহীন অবাধ প্রযুক্তির অপব্যহারেই কিশোর অপরাধ বাড়ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তবে শিশু-কিশোরদের অপরাধ নিয়ন্ত্রন করা না গেলে সামাজিক বিপর্যয় ঘটতে পাওে বলে মনে করছেন সচেতন মানুষ।
 
সংশ্লিষ্ট সুত্র থেকে জানা যায়, জেলার ১১টি থানায় চলতি বছরে বিভিন্ন অপরাধে মোট ৪৮টি মামলায় ৬১ জন শিশু-কিশোরকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলার বেশিরভাগই তুচ্ছ ঘটনায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে।  

সংঘর্ষ ও মারামারির ঘটনায় ১০ মাসে সর্বোচ্চ ২৪টি মামলায় ৩৪ জন কিশোরকে আসামি করা হয়েছে। আর এসব মামলার অধিকাংশেরই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। এর পরে রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা। ধর্ষণ, অপহরণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় দায়ের করা ১২ মামলায় আসামি রয়েছে ১৩ কিশোর। এর মধ্যে বেশিরভাগ মামলারই অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে। এছাড়াও মাদক, চুরি ও ছিনতাই সরকারি কাজে বাঁধাদানের অভিযোগেও একাধিক কিশোরের নামে মামলা রয়েছে।  

জেলা সমাজসেবা অফিস সূত্র জানিয়েছে, দু’টি হত্যা মামলার আসামি হিসেবে দু’জন কিশোর বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছে।  

সংশ্লিষ্ট সুত্র জানিয়েছে, জেলা শহরের দত্তবাড়ী, ধানবান্ধি, ব্যাপারীপাড়া, যমুনার ক্রসবার বাঁধ এলাকার হোসেনপুর, গয়লা, সয়াধানঘড়া, একডালা ও রানীগ্রাম মহলল্লায় মাঝে মধ্যেই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ বাধে। মহল্লায় পিকনিক বা বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে চাঁদা আদায়, ক্রিকেট খেলায় বাজি ধরা, ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া, মন্তব্য করা নিয়েও হামলা, দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ঘটনা ঘটে থাকে। ৩ থেকে ১৫দিন পর্যন্ত স্থায়ী এসব সংঘর্ষে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রও ব্যবহার করা হয়। ভাংচুর করা হয় বাড়ীঘর, লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। আর লুটপাট এবং এসব সংঘর্ষে ১৪-১৭ বছরের শিশু-কিশোররাই বেশি জড়িয়ে পড়ে। 

এছাড়া শহর ও শহরতলীর গ্রামগুলোর অনেক শিশু-কিশোররা-ফেন্সিডিল, ইয়াবা ও ড্যান্ডির মতো ভয়ানক মরণ নেশায় আসক্ত হচ্ছে। এসব মাদকের টাকা জোগাড় করতে ছিনতাই ও চুরির মতো ঘটনাতেও জড়িয়ে পড়ছে তারা। সম্প্রতি সদর উপজেলায় মাদকের টাকা না দেওয়ায় নিজের নানিকে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে এক কিশোরের বিরুদ্ধে।  

এদিকে করোনাকালে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অবারিত সময় থাকায় মোবাইল গেমস, ইউটিউবে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও দেখা, টিকটকসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল বিনোদনের দিকে ঝুঁকছে শিশু-কিশোররা। অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে ইউটিউবে মারামারি, নগ্ন ভিডিও দেখে কিশোর অবস্থাতেই যৌনতার দিকে আকর্ষিত হচ্ছে অনেকে। নিয়ন্ত্রণহীন অবাধ প্রযুক্তির ব্যবহার ও অভিভাবকদের নজরদারির অভাবে কিশোর বয়সেই প্রেম ও দৈহিক সম্পর্ক গড়ার মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে এ জেলাতে। প্রেমঘটিত কারণে অপহরণ, ধর্ষণ, যৌন হয়রানিসহ গুরুতর অপরাধেও সম্পৃক্ত হচ্ছে এখানকার কিশোররা। এর কারনে অপ্রাপ্ত বয়সে অনেক কিশোরই আবার কিশোরীদের সঙ্গে প্রেম করে তাদের নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা দায়ের হচ্ছে।ৎ
 
সিরাজগঞ্জ জেলা সমাজসেবা অফিসের প্রবেশনাল অফিসার হাসান শরীফ জানান, জেলার ছয়জন শিশু অপরাধী টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রয়েছে। এদের মধ্যে সবাই নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি। এছাড়া দু’জন হত্যা মামলার শিশু আসামি বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছে।  

সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আমিনুল ইসলাম বলেন, অবাধ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকায় অশ্লীল ভিডিও দেখে শিশুরা খারাপ জিনিসের প্রতি আকর্ষিত হচ্ছে। তারা প্রেম-ভালবাসা বা দৈহিক সম্পর্কের স্বাদ নিতে চায়। এ থেকে বন্ধু-বান্ধবী বা সমবয়সীদের সঙ্গে এসব সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করে।  এ থেকেই অনেকটা অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে। এছাড়া মাদকও শিশু-কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। 

তিনি আরও বলেন, শিশুকিশোরদেও এই বিষয়গুলো অভিভাবকদেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। সন্তানদের অবাধ মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রতি তাদেও আরো সচেতন হওয়া প্রযোজন।

সিরাজগঞ্জ আদালত পরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, গত তিন মাসে মোট ১৩টি মামলায় ১৫ জন শিশু আসামি রয়েছে। এর মধ্যে দু’টি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি ১১টি মামলার তদন্ত চলছে।  

জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, মোবাইল প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রহীন অবাধ ব্যবহারের কারণে তাদের মানষিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। যার ফলে মূল শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ছে, শিশুদের মধ্যে  মূল্যবোধ বাড়ছে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ধরনের প্রোগ্রাম দেওয়া হয়, তা থেকে প্রভাবিত হয়ে শিশুরা যৌনতা সহ নানা অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সে ক্ষেত্রে মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় কমিয়ে আনতে  শিশুদের স্বাভাবিক শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের দিকে জোর দিতে হবে। 

সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর এস এম মনোয়ার হোসেন বলেন, মোবাইল প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রহীন অবাধ ব্যবহারের কারণে শিশুকিশোরদের সুস্থ্য মানষিক চিন্তার অবনতি ঘটছে। এখান থেকে খারাপ জিনিস গ্রহন করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে যা খুবই উদ্বেগের বিষয়। 

তিনি আরও বলেন, আজকের শিশুরাই  আমাদেও আগামী দিনের ভবিষ্যত। তাই শিশুদেও স্বাভাবিক বেড়ে উঠা বড় হওয়ার জন্য আমাদেও সুস্থ্য পরিবেশ তৈরী কওে দিতে হবে। শিশু-কিশোরদেও অপরাধ নিয়ন্ত্রন করা না গেলে সামাজিক বিপর্যয় ঘটতে পাওে বলেও তিনি শঙা প্রকাশ করেন। এক্ষেত্রে আইন শৃংখলাবাহিনীর কঠোর নজরদারী এবং অভিভাবকদেও সচেতন হবার প্রতি জোর দেন তিনি

পুলিশ সুপার মো. হাসিবুল আলম (বিপিএম) বলেন, জেলায় অপরাধের মাত্রা বিশেষ করে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রন ও কমিয়ে আনতে কাজ করছে জেলা পুলিশ। 

তিনি জানান, পুলিশের সার্বক্ষণিক  কঠোর নজরদারির কারণে জেলায় কোনো কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠেনি। যেকোন স্থানে একাধিক কিশোরের জটলা দেখলেই পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে এ জেলায় ধর্ষণ ও অপহরণজনিত অপরাধে অনেক শিশু জড়িয়ে পড়ছে। অবাধ মোবাইল ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার, ইউটিউব, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ ভিডিও দেখে যৌনতার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে কিশোররা। এতে করে প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি দৈহিক সম্পর্কেও লিপ্ত হচ্ছে তারা।    

তিনি আরও বলেন, সন্তানের হাতে মোবাইল ফোন দেয়ার আগে তাদেও বয়সের বিষয়টি ভেবে দেখা উচিত। এছাড়া সন্তানেরা মোবাইলে কি ধরনের প্রোগ্রাম ব্যবহার করছে তারা বাইরে কোন ধরনের বন্ধুবান্ধবের সাথে মেলামেশা করছে সে বিষয়ে অভিভাবকদের নজর রাখা দরকার। এছাড়া শিশুদের ইন্টারনেটের অপব্যবহার বন্ধে অভিভাকদের সার্বক্ষণিক নজরদারি প্রয়োজন। সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যৌনতায় ভরা ভিডিও, নোংরা নাটক ও সিনেমা আপলোড করা বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।  
 
এসআর


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60; Online: 9513959 & 01552319639; Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft