For English Version
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০
হোম বেড়িয়ে আসুন

নীল জলরাশির সৈকত আর মায়া হরিণের সাগর কন্যা মনপুরা

Published : Tuesday, 11 August, 2020 at 1:45 PM Count : 345
অচিন্ত্য মজুমদার

বাংলাদেশের বৃহওম দ্বীপ জেলা ভোলার মূল ভুখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক অপরুপ সৌন্দর্যের নীল জলরাশির সমুদ্র সৈকত আর মায়া হরিণের সাগর কন্যা মনপুরা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সুন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এখানে তার চিন্তানিবাস গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

এখানে সুবিশাল ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে আছে নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিদের উড়ে বেড়ানো। নদীর বুকে জেলেদের মাছ ধরা। এখানে এলে নদী আর সাগরের মিতালীর অপরূপ সৈন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করবে।

সরেজমিনে মনপুরার বিভিন্ন স্থান ঘুরে ও সেখানকার মানুষের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, মনপুরা শুধু দেশে নয় দেশের বাইরেও দর্শণীয় জায়গা হিসেবে পরিচিত। যেকোন মানুষ কাজে অথবা ভ্রমণে এসে এখানকার রূপে মুগ্ধ হয়ে জায়গাটিকে ভালোবেসে ফেলেন। এখানে না এলে বোঝার উপায় নেই সবুজের দ্বীপ মনপুরায় লুকায়িত আছে কি সৌন্দর্য আর পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। কি এক মায়া জালে পর্যটক আর ভ্রমণ পিপাসুদের আটকে দেয় ৮শ বছরের পুরানো এ দ্বীপটি তা বোঝার উপায় নেই।

এখানে কাক ডাকা ভোরে নদীর বুক চিরে লাল টুকটুকে সূর্য হাঁসতে হাঁসতে যেমন তার দিন শুরু করে, তেমনি শেষ বিকেলে মেঘের হাত ধরে টুপ করেই ডুব দেয় নদীর জলে। অর্থাৎ এখান থেকে একইসঙ্গে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা সম্ভব। এসব অপার সম্ভাবনাকে পূঁজি করে মনপুরায় সম্প্রতি গড়ে উঠেছে "মনপুরা সী-বীচ"। আর ওই পর্যটন কেন্দ্রটি এখন ভ্রমনপিপাসুদের বাড়তি আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভোলা জেলা সদর থেকে ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ পুর্ব দিকে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে মেঘনার মোহনায় ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মনপুরা উপজেলা প্রায় দেড় লক্ষাধিক লোকের বসবাস। মিয়া জমির শাহ’র স্মৃতি বিজড়িত মনপুরা দ্বীপ অতি প্রাচীন। এখানে এক সময় পুর্তগীজদের আস্তানা ছিল।যার নিদর্শন এখনও বয়ে বেড়ায় এখানকার লোমশ কুকুর। মনপুরার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে সারি সারি ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। এখানকার ছোট বড় ৮-১০টি চরে বন বিভাগের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে সবুজের বিপ্লব। শীত মৌসুমে শত শত অতিথি পাখির কলতানে মুখরিত থাকে এসব চরাঞ্চল। এই চরগুলো হলো- চরতাজাম্মুল, চর পাতালিয়া, চর পিয়াল, চরনিজাম, চর সামসুউদ্দিন, লালচর, ডাল চর, কলাতলীর চর ইত্যাদি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এখানে বিশেষ কিছু খাবার রয়েছে। তার মধ্যে শীতের হাঁস, মহিষের কাঁচা টক দই, টাটকা ইলিশ, বড় কই মাছ, জাগুর, কোরাল, বোয়াল ও গলদা চিংড়ি অন্যতম। মেঘনা নদীর টাটকা ইলিশ আর চরের মহিষের কাঁচা দুধের স্বাদ এনে দিতে পারে ভিন্ন এক অনুভূতি।

ঐতিহাসিক বেভারিজ মনপুরার নামকরণ নিয়ে লিখেছেন মনগাজি নামের এক ব্যক্তি। সেই সময়ের জমিদার থেকে মনপুরার জমি বন্দোবস্ত নেন অষ্ঠাদশ শতাব্দীর মধ্য যুগে। এখানে বেশ ভালই ছিলেন তিনি। কোন এক সময় মনগাজি বাঘের থাবায় প্রাণ হারালে তখন তার নামানুসারে দ্বীপটির নাম করণ হয় মনপুরা।

তবে স্থানীয়দের মতে, এখানকার খাঁটি দুধ খেয়ে ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলা দেখে মানুষের মন ভরে যেত। এ জন্য এর নামকরন করা হয় মনপুরা। তবে মনপুরার নামকরণ নিয়ে এখনও নানা মতভেদ রয়েছে।

১৮৩৩ সালে মনপুরাকে ভোলা জেলার অধীনে স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। ১৯৮৩ সালে মনপুরাকে উপজেলায় রুপান্তরিত করা হয়। এভাবে এগিয়ে যায় আজকের মনপুরা। আয়তন ৩৭ হাজার ৩১৯ বর্গ মিটার। ইউনিয়ন ৪টি, গ্রাম ৩৮টি, জনসংখ্যা প্রায় দেড় লক্ষাধিক। কৃষি জমি ৩০ হাজার ৫০৪ একর। বনায়ন ১১ হাজার ১১৯ বর্গমিটার।   রাস্তার দু’পাশে বনায়ন ১০০ কিলোমিটার। সর্বমোট রাস্তা ৫৬৬ কিলোমিটার। এখানে সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয় ৪৩টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৭টি, নিম্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয় একটি, নিন্ম বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় একটি, মাদ্রাসা ৬টি, কলেজ দুটি ও একটি করে আলিম ও ফাজিল মাদ্রাসা রয়েছে।

এখানে প্রধান সমস্যা যোগাযোগ ব্যবস্থা। মন চাইলে যে কেউ মনপুরা আসতে বা যেতে পারবেনা। এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে রুটিন মাফিক। প্রতিদিন ঢাকা থেকে একটি লঞ্চ বিকেল সাড়ে ৫টায়, আরেকটি লঞ্চ সাড়ে ৬টায় হাতিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে মনপুরা হয়ে পরদিন সকাল ৯টার সময় হাতিয়া পৌঁছে। ওই লঞ্চ দুটি আবার হাতিয়া থেকে ছাড়ে বেলা ১২টায় আরেকটি দুপুর ১টায়। মনপুরাতে আসে দুপুর ১টায় আরেকটি ২টায় এবং ১ ঘন্টা যাত্রা বিরতি থাকে রামনেওয়াজ লঞ্চঘাটে।

মনপুরার মানুষ যে লঞ্চে করে ঢাকার থেকে মনপুরা আসেন আবার ওই লঞ্চে করে ঢাকায় ফিরে যান। এছাড়া ঢাকা কিংবা বরিশাল থেকে ভোলা হয়ে তজুমুদ্দিন সি-ট্রাক ঘাট থেকে মনপুরা যাওয়া যায়। সী-ট্রাকটি প্রতিদিন সকাল ১০টায় মনপুরা হাজীর হাট ঘাট থেকে ছেড়ে বেলা ১২টায় তজুমদ্দিন সী-ট্রাক ঘাটে পৌঁছে। আবার ওই দিন বিকেল ৩টায় তজুমদ্দিন সী-ট্রাক ঘাট থেকে ছেড়ে সন্ধ্যা ৬টায় মনপুরা হাজীর হাট সী-ট্রাক ঘাটে পৌঁছে।

অপরদিকে, চরফ্যাশনের বেতুয়া ঘাট থেকে মনপুরার সাকুচিয়া জনতা বাজার রুটে প্রতিদিন দুটি লঞ্চ চলাচল করে। এছাড়া প্রতিদিন সাকুচিয়া থেকে রামনেওয়াজ হয়ে আলেকজেন্ডারের উদ্দেশ্যে একটি লঞ্চ ছেড়ে যায়। ওই রুটেও প্রতিদিন শত শত মানুষ আসা যাওয়া করে। তবে আশার কথা হচ্ছে দিন দিন এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

মনপুরাতে ভালো মানের পর্যটন হোটেল গড়ে উঠেছে। সরকারি ভাবে জেলা পরিষদের অর্থায়নে আধুনিক ৪ তলাবিশিষ্ট ডাক বাংলো রয়েছে। বেসরকারিভাবে তজুমদ্দিন রুটে এবং চরফ্যাশন মনপুরা রুটে স্পীডবোট সার্ভিস চালু আছে। যাতে পর্যটকরা কম সময়ে মনপুরা যেতে পারবেন। মনপুরায় ভাল মানের আরও হোটেল গড়ে উঠলে পর্যটকদের আগমন বাড়বে। 

স্থানীয়রা মনে করছেন, প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করলে মনপুরা হতে পারে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র।

মনপুরার মানুষ অতিথি পরায়ণ। অতি অল্প সময়ের মধ্যে যে কাউকে আপন করে নেয়। এখানকার মানুষ কৃষি ও মৎস্য সম্পদের ্পবর নির্ভরশীল। মনপুরার শতকরা ৮০ ভাগ লোক কৃষক ও মৎস্যজীবী।

মনপুরা ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ মো. জাহাঙ্গীর আলম, শিক্ষাবিদ এ কে এম শাহজাহান, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ ভূঁইয়া জানান, এখানকার অপার সম্ভাবনা নিয়ে মানুষ তেমন ভাবছেন না। এখানকার অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করেন। তাছাড়া শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণে এ দ্বীপের মানুষ দেশের মূল ধারা থেকে অনেকটা পিছিয়ে আছে। তবে উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে এখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব।





উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন জানান, মনপুরাকে নদী ভাঙ্গণের হাত থেকে রক্ষা করার পাশাপশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিনোদনের ব্যবস্থা করলে মনপুরা হতে পারে আদর্শ পর্যটন কেন্দ্র।

মনপুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, 'এ দ্বীপটি ভোলা জেলার মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও নানা উপকরণ ছড়িয়ে আছে এ দ্বীপে। মনপুরার অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা, ভাল মানের হোটেল, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিসহ বিভিন্ন সুবিধা বাড়াতে পারলে মনপুরা হতে পারে পর্যটকদের দর্শণীয় স্থান।'

মনপুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বেগম শেলিনা আকতার চৌধুরী বলেন, 'একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার একটি স্বপ্ন মনপুরাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। আমরা আমাদের এমপি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের সঙ্গে সমন্বয় করে মনপুরাকে একটি আদর্শ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছি। তবে প্রাকৃতিক ভাবেই মনপুরাতে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো অনেক কিছু রয়েছে।

-এমএ


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60; Online: 9513959 & 01552319639; Advertisemnet: 9513663
E-mail: info@dailyobserverbd.com, online@dailyobserverbd.com, news@dailyobserverbd.com, advertisement@dailyobserverbd.com,   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft