For English Version
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২০
হোম সারাদেশ

২৮০টি নৌকার মাধ্যমে ডিম সংগ্রহ হালদায় মা মাছ ডিম ছেড়েছে

Published : Friday, 22 May, 2020 at 6:32 PM Count : 78
উজ্জ্বল নাথ, হাটহাজারী(চট্টগ্রাম)

দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে কার্প জাতীয় মা মাছ ডিম ছেড়েছে। হালদা নদীতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, বালুউত্তোলন, ড্রেজার ও ইঞ্জিন চালিত নৌকা চলাচল বন্ধ থাকা এবং নদীতে ব্যাপক হারে রেণু পোনা অবমুক্ত করার কারণে নদীতে মা মাছের মজুদ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মৌসুমের সময় মা মাছের ব্যাপক আনাগোনা ও লক্ষ্য করা গেছে। 

গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২ টার দিকে নদীতে ভাটার সময় আজিমের ঘাট ,কাগতিয়ার ঠেক, নাপিতের ঘাট, কুমারখালী, রামদাশ মুন্সিরহাট খাড়ির মূখে মা মাছ নমুনা ডিম ছাড়ে। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে মা মাছ নদীতে ডিম ছাড়া শুরু করলে ও বেলা বাড়ার সাথে সাথে ডিম ছাড়ার পরিমাণ ও বৃদ্ধি পেতে থাকে। গত বছরের চেয়ে ডিমের পরিমাণ এবার বৃদ্ধি পেয়েছে। 

ডিম আহরণকারীরা চলতি অমাবস্যার তিথির জো তে ডিম ছাড়ার ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন। সে কারণে জো র শুরু থেকে ডিম আহরণকারীরা নৌকা , ডিম আহরণের সরঞ্জাম নিয়ে নদীতে পালাক্রমে পাহাড়ায় ছিলেন। উল্লেখিত এলাকায় নমুনা ছাড়ার বিষয়টি আহরণকারীদের মধ্যে জানাজানি হয়ে গেলে সকলে নদীতে ডিম আহরণের জন্য নেমে পড়েন ডিম আহরণকারীরা। 

ডিম আহরণকারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বাংলা বছরের গত বৈশাখ মাসে অমাবস্যা ও পূর্ণিমার দুইটি তিথি ছিল। এসময় বজ্রসহ হালকা ও ভারি বর্ষণও হয়েছিল। বজ্রসহ বৃষ্টির আলামত দেখে ডিম আহরণকারীরা নদীতে মা মাছ ডিম ছাড়বে বলে এ প্রত্যাশা নিয়ে ডিম আহরণকারীরা সরঞ্জাম নিয়ে নদী পাহাড়ায় ছিল। কিন্তু মা মাছ নদীতে ডিম ছাড়েনি। জৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যার এ তিথির মধ্যে ডিম ছাড়বে বলে আশা করেছিল ডিম আহরণকারীরা। কিন্তু বৃষ্টির কোন আলামত দেখতে না পেয়ে এবারও ডিম ছাড়বে কিনা এ নিয়ে ডিম আহরণকারীরা সন্ধিহান ছিল। ঘূর্ণঝড় আম্ফান দূর্বল হয়ে নি¤œচাপে পরিণত হওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়। দিবাগত মাঝ রাতে প্রবল বর্ষণ শুরু হয়। কিন্তু কোন বজ্রপাত ছিল না। এরমধ্যে ও বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে হঠাৎ করে মা মাছ নদীর বিভিন্ন স্থানে ডিমের নমুনা ছেড়েছে। নমুনা ছাড়ার খবর পেয়ে ডিম আহরণকারীরা ডিম আহরণের সরঞ্জাম নিয়ে নদীতে নেমে পড়ে। গতকাল শুক্রবার সকালে নদীতে জোয়ার শুরু হলে মা মাছ হালদা নদীর মাছুয়াঘোণা হ্যাচারী সংলগ্ন স্লুইচ এলাকা, আজিমের ঘাট,নাপিতের ঘাট, আমতুয়া, কাগতিয়ার ঠেক, কুমারখালী,ব্রিকফিল্ড ও রামদাশ মুন্সিরহাট,খাড়ির মুখ সংলগ্ন এলাকায় ডিম ছাড়তে শুরু করে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ডিম ছাড়ার পরিমাণ ও বৃদ্ধি পেতে থাকে।  এবার ২৮০ টি নৌকায় ৬১৫ জন ডিম আহরণকারী নৌকা নিয়ে নদী থেকে ডিম আহরণ করেছেন। এদিকে মা মাছ নদীতে ডিম ছাড়ার পূর্ব থেকে হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলায় ডিম থেকে রেণু ফুটানোর সরকারি ভাবে প্রতিষ্ঠিত হ্যাচারী গুলো যথাক্রমে মদুনাঘাট হ্যাচারী, শাহমাদারী, মাছুয়াঘোনা, গড়দুয়ারা, রাউজান উপজেলার মোবারকখীল ও মগাশা¯্রী এলাকায় হ্যাচারী গুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তাছাড়া পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন এর মাধ্যমে ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন ( আইডিএফ) এর সহায়তায় আধুনিক ভাবে স্থাপন করা ১৫৭ টি নদীর পাড়ে মাটির কুয়া গুলো ডিম থেকে রেনু ফুটানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতি নৌকা থেকে গড় পড়তা ৩/৪ বালতি হারে ডিম পাওয়া গেছে বলে ডিম আহরণকারীরা জানান। গত বছর ২০১৯ সালে নদীতে ২৪০ টি নৌকার মাধ্যমে ২ হাজার ২৫ বালতি ডিম আহরণ করা হয়েছিল। এবার পবিত্র রমজান ও করোনা ভাইরাস সংক্রামণ থাকলেও পরিবেশ অনুকুলে থাকায় নদী থেকে ডিম আহরণের জন্য নৌকার পরিমাণ গত বছরের চেয়ে বেড়ে গেছে বলে আহরণকারীরা জানান। 

উল্লেখ্য: ২০১৪ সালে ১৩ মে  ৩৬৪টি নৌকা ডিম সংগ্রহ করেছে ১৬,৫০০কেজি।  ২০১৫ সালে ২১ এপ্রিল  ২৭৫টি নৌকা ডিম সংগ্রহ করেছে ২৮০০ কেজি। ২০১৬ সালে ২০ মে  ২৪৫টি নৌকা ডিম সংগ্রহ করেছে ৭৩৫ কেজি। ২০১৭ সালে ২২ এপ্রিল  ১০৫টি নৌকা ডিম সংগ্রহ করেছে ১৬৮০ কেজি। ২০১৮ সালে ২০ এপ্রিল   ৪০৫ টি নৌকা ডিম সংগ্রহ করেছে ২২৬৮০ কেজি। ২০১৯ সালে ২৫ মে  ২৩০টি নৌকা ডিম সংগ্রহ করেছে ৬৯৮৫ দশমিক ৭ কেজি। 

পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন এর মাধ্যমে ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন ( আইডিএফ) এর সহকারি ভ্যালু চেইন ফ্যাসিলিটেটর সজীব হোসেন জানান,  হালদা নদীর মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য আইডিএফ গৃহিত কর্মসূচীর মাধ্যমে হালদা নদীতে মাছের অভয়ারণ্য সৃষ্টির জন্য এ প্রকল্প কাজ করছে। এবার নদীতে ২৮০ টি নৌকার মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৬ শ জন ডিম আহরণ করছেন। সরকারি ভাবে প্রতিষ্ঠিত হ্যাচারী ছাড়াও তাদের আধুনিক পদ্ধতিতে স্থাপিত মাটির কুয়ায় প্রশিক্ষণ প্রাপ্তকর্মীরা ডিম থেকে রেণু ফুটাবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত দেশের একমাত্র নদী ভিত্তিক গবেষনা প্রতিষ্ঠান হালদা রির্চাস ইনষ্টিটিউট ও আইডিএফ যৌথ ভাবে হালদা উন্নয়ন ও সংরক্ষের জন্য কাজ করেছে। 





হাটহাজারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে হালদা নদীর বিভিন্ন স্থানে মা মাছ নমুনা ডিম ছেড়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে মা মাছ নদীর বিভিন্ন স্থানে ডিম ছাড়া শুরু করলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে ডিম ছাড়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। হালদা নদীতে এবার মা মাছের মজুদ বেশী। নমুনা ডিম দেওয়ার পর তিনি , জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী , হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া,আইডিএফএর কর্মকর্তারাসহ সংশ্লিষ্টরা হালদা নদীর ডিম ছাড়ার স্থান পরিদর্শন করেছেন। ডিম আহরণকারীরা রেণু ফুটানোর জন্য নদী থেকে সংগৃীত ডিম নিয়ে আসছেন হ্যাচারী গুলোতে। এসব কাজে যাতে কোন ব্যর্তয় না ঘটে সেজন্য মৎস্য বিভাগ সার্বক্ষণিক নজরদারীতে রয়েছেন।

চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও হালদা নদী গবেষক অধ্যাপক মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, মৎস্য বিভাগ , আইডিএফ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রির্চাস ল্যাবেটারি তিনটি প্রতিষ্ঠান যৌথ হিসাবে মাধ্যমে বের করেছে গত কয়েক বছরের চেয়ে এবার বেশী ডিম সংগৃীত হয়েছে। এবার ২৮০ টি নৌকার মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৬ লোক হালদা নদী থেকে ডিম সংগ্রহ করেছে। এবারের সংগৃীত ডিমের পরিমাণ আনুমানিক ২৫ হাজার ৫ শ ৩৬ কেজি। নদীতে ডিম আহরণ অব্যাহত রয়েছে। সংগৃহীত ডিমের পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তিনি আরো বলেন, গত বছর ২৪০ টি নৌকার মাধ্যমে ২২ হাজার ৬ কেজি ডিম আহরণ করা হয়েছিল।  প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়ের কঠোর নিদের্শনার কারণে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের পরিমাণ কমে যাওয়া,ইঞ্জিন চালিত নৌযান চলাচল বন্ধ,মা মাছ শিকারের উপর নজরধারী,সর্বপরী নদী পাহাড়ার ব্যবস্থার কারণে মা মাছের অবাধ বিচরণ এর কারণে এবার নদীতে সব চেয়ে বেশী ডিম ছেড়েছে মা মাছ। সর্বমহলের সহযোগীতার কারণে নদীতে ডিম ছাড়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থা ধরে রাখা গেলে ভবিষ্যতে ডিম ছাড়ার পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশাবাদী বলে উল্লেখ করেন।

ইউএনও মোহাম্মাদ রুহুল আমিন জানান, গত ২০ মাস ধরে উপজেলা প্রশাসন হালদা নদীতে কঠোর নজরদারির মাধ্যমে অবৈধ জাল ও ড্রেজার জব্দ, বালু উত্তোলন ও ইঞ্জিন চালিত নৌকা বন্ধ রাখেছে। হালদা দূষণ মুক্ত করতে উপজেলা প্রশাসন পরিবেশ অধিদপ্তরের সহায়তায় হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং বেসরকারি এশিয়ান পেপার মিল বন্ধ করে দেওয়ার কারণে নদীতে মাছের মজুদ বৃদ্ধি পেয়েছে। হালদায় অভিযানে  ১ লাখ ১৫ হাজার ঘনফুট বালি ও ২ লাখ ১৩ হাজার মিটার অবৈধ জাল ধ্বংস করা হয়, বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার পাইপ, ৯টি ড্রেজার ও ১২টি ইঞ্জিন চালিত নৌকা ধ্বংস করা হয়। অভিযানে জরিমানা আদায় করা হয় ৯০ হাজার টাকা, ৩ জনকে ১ মাস করে কারাদ- দেওয়া হয়েছে ও জব্দকৃত বালু গুলো নিলামে বিক্রি করে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকার রাজস্ব আয় আদায় করা হয়েছে। ধারাবাহিক অভিযানের কারণে এবার হালদা নদীতে মা মাছের ডিম ছাড়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।  


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60, Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft