For English Version
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০
হোম অনলাইন স্পেশাল

মরণের পর রাষ্ট্রীয় সম্মানটুকু যেন দেওয়া হয় : আবদুল মমিন চৌধুরী

Published : Sunday, 15 December, 2019 at 8:46 PM Count : 576
মুহাম্মদ আবু তাহের ভূঁইয়া

'আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য মরণপণ লড়াই করে যুদ্ধ করেছি। একাত্তরে আমি ছিলাম টগবগে তরুণ, পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তির জন্য এবং নিজের বিবেকের তাড়নায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেই। তখন কিন্তু কারো সনদ বা সার্টিফিকেট নেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। দীর্ঘ সংগ্রাম ও নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত ও দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার পর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে স্বাধীন স্বদেশে কোন সনদ নেওয়ার উৎসাহ ও প্রয়োজন বোধ করিনি।'

'স্বাধীনতা পরবর্তী নিজের জন্য বা পরিবারের জন্য মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোন সুযোগ-সুবিধা বা কোন ভাতা পাইনি এবং চাইনি। সমগ্র জীবনটা কর্মের সংগ্রাম আর দেশ গঠনে কাজ করেছি। এখন আমার বয়স ৭৩ বছর। আমি এখন জীবন সায়াহ্নে। সদাশয় সরকারের কাছে আমার জীবনের শেষ চাওয়াটি হল- আমাকে যেখানে সমাহিত করা হবে, সেখানে রাষ্ট্রীয় সম্মানটুকু যেন দেওয়া হয়।'

জীবনের পড়ন্তবেলায় এসে কথাগুলো বলেছেন ফেনী সদর উপজেলার ধলিয়া ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মমিন চৌধুরী।

ছাত্র রাজনীতি, শ্রমিক রাজনীতি, সাংবাদিকতার পাশাপাশি, ’৬৯র গণঅভ্যূত্থান এবং ৭১'র স্বাধীনতা সংগ্রামে এক লড়াকু সৈনিক ছিলেন আবদুল মমিন চৌধুরী।

১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল মমিন চৌধুরী। তার পিতা মরহুম মাওলানা আবু আহমেদ, একজন ইসলামী চিন্তাবিদ এবং বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত ’কোরান চর্চায় সহায়’ গ্রন্থের রচয়িতা। তিনি দৈনিক আজাদ পত্রিকার স্বত্বাধিকারী ও সম্পাদক মাওলানা আকরাম খাঁর সারা জীবনের সহচর ছিলেন। মাতা মরহুমা হুরের নেছা চৌধূরী।

তিনি স্থানীয় ধলিয়া হাই স্কুল ও লেমুয়া হাই স্কুলে পড়ালেখা শেষে পিতার চাকরির সুবাধে ঢাকার আজিমপুর চলে যান। সেখানে ওয়েস্টেন্ড স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন। স্কুল জীবনেই তিনি ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। ঢাকায় ১৯৬৭ সালে ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) আজিমপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে তিনি কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি ১৯৬৮ সালে ঢাকা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন, ১৯৬৯ সালে ঘাট শ্রমিক ইউনিয়ন ও সুইপার এসোসিয়েশনের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৮ সালে আবদুল মমিন চৌধুরী সাপ্তাহিক গণশক্তি পত্রিকায় (সম্পাদক- প্রখ্যাত লেখক বদরুদ্দিন ওমর) সহকারী সম্পাদক পদে যুক্ত হন। তখন তার বাবা মাওলানা আবু আহমেদ দৈনিক আজাদ পত্রিকা ও পরে বাংলা একাডেমীতে কর্মরত ছিলেন।

১৯৬৯ সালে গণঅভ্যূত্থানের সময় আবদুল মমিন চৌধুরীর বন্ধু বদিউল আলম (বর্তমানে নিউজ টুডে কর্মরত), আসাদ (শহীদ আসাদ) ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তোফায়েল আহমেদসহ অন্যরা একসঙ্গে পিকেটিং করেছেন।

আবদুল মমিন চৌধুরী রাজনৈতিক জীবনে ভাসানী ন্যাপ করলেও স্বাধীনতা সংগ্রামে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, '১৯৭১ সালে আমি টগবগে তরুণ। বয়স ২৬ বছর। মার্চ মাসে যুদ্ধ শুরু হলে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আমরা কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ফেনীর মুন্সীর হাটে এক আত্মীয়ের বাড়িতে পৌঁছি এবং রাতে বিলোনীয়া সীমান্ত দিয়ে ভারতের শ্রীনগর ক্যাম্পে যোগ দেই। এই ক্যাম্পে ফাজিলপুরের মর্তুজা ভূঁইঞা, এডভোকেট গিয়াস উদ্দিন নান্নুসহ অনেকে ছিলেন। সেখানে ইনচার্য ছিলেন ব্যারিস্টার নুরুল আফসার এবং মিরসরাই এর ওবায়েদ বলি (পরে এমপি হয়েছেন)।'

মমিন চৌধুরী বলেন, 'সেখানে ট্রেনিং শেষে জুন মাসের দিকে অধ্যাপক বাদল দত্তসহ আমাদের কয়েকজনকে কিছু গ্রেনেড দিয়ে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে পাঠান। তখন আমরা ঢালুয়া সীমান্ত দিয়ে সেনবাগ হয়ে ছমিরমুন্সী কুতবেরহাট হয়ে বসুরহাট আসি। সেখান থেকে ফেনী নদীর ওপর স্লুইসগেট পার হয়ে কাজীরহাট হয়ে মঙ্গলকান্দি দিয়ে নিজ এলাকায় প্রবেশ করি। উদ্দেশ্য মা-বাবার সঙ্গে শেষবারের মত দেখা করা এবং স্থানীয় যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য উদ্ধুদ্ধ করা।'

'বাংলাদেশে কিছুদিন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে আগস্ট মাসের দিকে আমরা পাঁচগাছিয়া, রাজাপুর, সিন্দুরপুর, আলকরা মাঠ হয়ে গিনাগাজী দিয়ে ভারতের চোত্তাখোলা পৌঁছি। সেখানে তখনকার সময়ে টঙ্গীর শ্রমিক নেতা ইব্রাহীম রাতের বেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের সীমান্ত দিয়ে পারাপারে সহযোগিতা করতেন। ভারতের চোত্তাখোলায় আমরা পুনরায় ট্রেনিং নিয়ে আবার বাংলাদেশে রওয়ানা হই। তখন আমাদের সঙ্গে ছিলেন আত্রাই কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল বাবু বাদল দত্ত, মঙ্গলকান্দি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক শশাঙ্ক দাস গুপ্তসহ (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) আরও কয়েকজন। সে সময় কে-ফোর্সের কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন হায়দারের নেতৃত্বে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।'

দেশে ফিরে আবদুল মমিন চৌধুরী সহযোগী মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মরণপণ লড়াই করে পাক হানাদার বাহিনী ও আল বদর, আল সামসসহ স্বাধীনতা বিরোধীদের পরাজিত করে দেশের স্বাধীনতায় গৌরবময় ভূমিকা পালন করেন।





আবদুল মমিন চৌধুরী আক্ষেপ করে বলেন, 'জীবদ্দশায় দেশে এবং নিজ জেলায় কখনও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোন প্রকার সম্মান পাইনি বলে কোন দুঃখ নেই। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মরণের পর যেন রাষ্ট্রীয় সম্মানটুকু দেওয়া হয়। এইটুকু জীবনের শেষ চাওয়া।'

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, ফেনী শাখার সাবেক সভাপতি আবদুল মোতালেব বলেন, 'একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু বার বার আহ্বান সত্ত্বেও তাদের মধ্যে অনেকেই নির্দিষ্ট সময়ে নাম নিবন্ধন বা সংশ্লিষ্ট ফরম পূরণ করে জমা দেননি। তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সরকারের বা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের।'

ফেনী জেলা প্রসাশক মো. ওয়াহিদুজজামান বলেন, 'মুক্তিযোদ্ধারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান। মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। এক্ষেত্রে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারে সরকারের নীতিমালার আলোকে সবকিছু করা হচ্ছে।'

-এমএ


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60; Online: 9513959 & 01552319639; Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft