For English Version
শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯
হোম মতামত

প্রতিবন্ধী মানে প্রতিভাবন্ধী নয়

Published : Monday, 2 December, 2019 at 9:26 PM Count : 351
মিছবাহুল আলম

" align=

নেত্রকোণার সমীরণ সরকার ও সীমা রাণী সরকারের সন্তান হৃদয় সরকার। জন্মের সময় অক্সিজেনজনিত কারণে তার ব্রেইনে চাপ পড়ায় তার হাঁটাচলায় সমস্যা হয়। মায়ের কোলে চড়েই সে স্কুল, কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিযুদ্ধে অংশ নেয় এবং উত্তীর্ণও হয়। কিন্তু প্রশাসনিক নির্মম নীতিমালার যাঁতাকলে হৃদয়ের ভর্তি আটকে যায়। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র, শিক্ষক এবং বিভিন্ন এনজিও’র সহযোগিতায় হৃদয় সরকার এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র।

“প্রতিবন্ধী” শব্দটা শুনলেই আমাদের মাথায় সাধারণত একজন ব্যক্তির চেহারাই ভেসে আসে যে আরেকজনের কাছে হাত পাতছে, কিছু চাইছে, আর মানুষও তাদেরকে সাহায্য করছে, যারা কিনা স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেনা, সবসময় অন্যদের সহযোগিতা নিতে হয়। শিল্পসাহিত্য, পড়ালেখা, মানবাধিকার কিংবা সমাজে নেতৃত্ব দেয়া এসবতো ভাবাই যায় না তাদের ব্যাপারে। আমাদের সমাজে এখনো এমন ধারণার একেবারে মূলোচ্ছেদ হয়নি, যদিও কিছু পরিবর্তন লক্ষণীয়। 

এসব অদ্ভুত ধারণা জন্মানোর পেছনে যৌক্তিক কারণও রয়েছে। কারণ আমরা যে সমাজে বেড়ে উঠেছি, সে সমাজটাই আমাদের শিক্ষণের প্রথম প্রতিষ্ঠান। সমাজের মানুষদের দেখে, তাদের মুখে শুনে, তাদের নির্দেশনা, সঙ্গায়ন, পরামর্শ এসবই আমরা ছোটবেলা থেকে জেনে আসছি, বুঝে আসছি।

যে সমাজের মানুষজন মেয়েদের স্কুলে যাওয়াকে পাপ হিসেবে জানতো, নাক ছিটকাতো, সে সমাজের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নারীর সংজ্ঞাটা এরকম। আবার যে পাড়া/সমাজে একটা মেয়েকে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতে দেখে অন্য মানুষরা তিরস্কার নয় বরং উৎসাহ দেয়, সে সমাজের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নারীর পরিচয়টা আরেকরকম। ঠিক একইভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিও দৃষ্টিভঙ্গিটা আমাদের ঐ সমাজ থেকেই জন্মায়, আর আমরা ওভাবেই ভাবতে শিখেছি এবং তাদের প্রতি মনোভাবটা সমাজের শেখানো পন্থায়ই পোষণ করি। তাদেরকে অক্ষম ভাবি। যতক্ষণ না কারো মাধ্যমে সে ধারণাটা পরিবর্তনের জন্য উৎসাহিত না হই কিংবা সে ধারণার ব্যতিক্রম কিছু চোখে
আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে না দেয়।

মিছবাহুল আলম

মিছবাহুল আলম

আমাদের সমাজে একজন হলেও প্রতিবন্ধী মানুষকে দেখেছি, যিনি হয়তো আর্থিক সমস্যা অথবা অন্য কোন কারণে লেখাপড়া করতে পারেননি, নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার সুযোগ পাননি, যার দরুণ তিনি ওই গ্রাম/পাড়ায় নিম্ন শ্রেণির কোন কাজ করছেন না হয়, ঘরে বসে আছেন। 

তাই আমাদের মাথায় এটি আঠার মতো গেঁথে গেছে যে, প্রতিবন্ধীরাতো স্বাভাবিক না, তারা আমাদের চেয়ে ব্যতিক্রম নয় শুধু মানবিক অধিকার প্রাপ্তিতেও তারা নিম্নগণ্য আর যোগ্যতায়তো অনেক পিছিয়ে সেটা আগেই মাথায় সেটাপ হয়ে আছে। কিন্তু একবারও কি চিন্তা করে দেখেছি যে?, সে ব্যক্তিটিকেই যদি যথাযথ সুযোগ করে দিতাম, মানুষজন তাকে আলাদা না ভেবে উৎসাহিত করতো, ঠিকই সম্মানের সহিত অন্য ৮/১০ জনের মতোই কর্ম করে উপার্জন করতেন। তখন আমরাই আবার সমাজে তার অবস্থানকে আলাদা করে দেখতাম না। কারণ হৃদয় সরকারের বেলায় যদি এমন ঘটতো যে, পরিবার তাকে পড়াশুনা না করিয়ে হাল ছেড়ে দিতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অধিকারের জন্য না লড়ে যেতেন, তার সমাজের বাকি মানুষগুলো যদি নিয়মিত তিরস্কারই করে যেত, তাহলে কয়েকবছর পর হৃদয় ঘরেই বসে থাকতো কিংবা কোন নিম্নমানের কাজ করে দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে হতো নতুবা অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়েই বাকি জীবন চালাতে হতো। আর সে সমাজের প্রজন্ম এটি শিখতো- প্রতিবন্ধী মানে অক্ষম, অচল।

তাহলে আমরা পরিবর্তনের গোলক ধাঁধাটা খুঁজে পেলাম আমাদের সমাজ, পরিবারে। যেখান থেকেই সবকিছুর হাতে-খড়ি নিয়ে থাকি। তা না হলে আমাদের দেশেরই কোন এক সমাজ থেকেই তো উঠে এসেছে, হৃদয়ের মত এরকম সহস্র তরুণ-তরুণী, যারা সমাজের অন্যদের মতো অবস্থান তৈরি করেননি শুধু, তাদের প্রতিভার মাধ্যমে এটি প্রমাণ করতে শতভাগ সক্ষম হয়েছেন যে, তারা অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠও। তাদের মধ্য থেকে যদি হাতেগোনা কয়েকটি উদাহরণ টেনে আনি তাহলে বলতে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিবল সাংমার কথা। শারীরিক প্রতিবন্ধীতার কারণে যাকে হুইল চেয়ারে চড়তে হয়, অন্যের সহযোগিতা নিতে হয় ঠিকই কিন্তু থেমে থাকেনি তার স্বপ্ন জয়ের দূর্গম পথচলায়। 

দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিয়ে সদস্যদের মাঝে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার এই সফলতার পেছনে নিজের উদ্যমের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরের মানুষদের ইতিবাচক মনোভাব একটা বড় হাতিয়ার কাজ করেছে। কারণ, তারা এটি বিশ্বাস করেছিল যে, চিবল ছাত্রনেতা হিসেবে যোগ্য এবং তাকে দিয়ে শিক্ষার্থীদের উপকার হবে। প্রতিবন্ধীতার কারণে তাকে কোনভাবে ছোট করে দেখা হয়নি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাল্গুনী দেবের গল্পতো একেবারে জলন্ত। বিদ্যুৎপৃষ্ঠ হয়ে সেই ছোটবেলায় দু’হাতের কনুই পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু তাই বলে থেমে গিয়েছেন? না। স্কুল, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার করেন অনেক সংগ্রাম-সাধনা করে। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর প্রতিভার কারণে তাকে পড়াশুনা শেষ করে বসে থাকতে হয়নি, এই ৩রা ডিসেম্বরেই ব্র্যাক তাকে হিউম্যান রিসোর্স অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে। তার এ সফলতা কখনোই আসতোনা যদি না তার পরিবার আর সমাজ তাকে ঘরে লুকিয়ে না রেখে বরং এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করতো।

দৃষ্টিশক্তিহীন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুমাইয়া তাসনিমের গল্প থেকে আমরা একই সূত্র পেয়ে থাকি। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক মনোভাব না থাকলে সুমাইয়ার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংলিশ এ মাস্টার্স করে বিদেশের ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করানো এতো সহজ ছিলনা। কিন্তু এর উল্টাটাও তো ঘটতে পারতো, তখন কি তার এ প্রতিভা/মেধা কাজে লাগতো?

আসলে সব মানুষই কিছু চমৎকার প্রতিভা নিয়ে জন্মায় কিংবা একটা জায়গায় তার পাণ্ডিত্য থাকেই। যথাযথ সুযোগ আর উৎসাহের অভাবেই অনেকের সে মেধা/প্রতিভার প্রতিফলন দেখাতে পারেনা। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সাথে স্বেচ্ছাসেবী কাজ করতে গিয়ে যেটুকু দেখেছি, তাদের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো একটা প্রতিভার ক্ষেত্রে দারুন দখলদারিত্ব রয়েছে। এবং সে জায়গায় অন্যদের তুলনায় অনেক ভালো। এসব দেখে যতটা না অনুপ্রাণিত হয়েছি তারচেয়ে বেশি শিখেছি- “প্রতিবন্ধী মানে প্রতিভাবন্ধী নয়”।

" align=

সরকারের পাশাপাশি ‘দ্যা বিজনেস এক্সপ্রেস’ পত্রিকার তথ্যমতে এদেশে বর্তমানে ৩৯৯ টি এনজিও ডিসেবিলিটি নিয়ে কাজ করছে, অবাক করার মতো বিষয় নয়কি! একটি এনজিও যদি একটিমাত্রউপজেলার প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিদের উন্নয়নে কাজ করতো, তাহলে তাদের ক্ষমতায়ন কিংবা অধিকার প্রতিষ্ঠায় আর সংগ্রাম করতে হয়না।তবুও কেন আমরা এখনো এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে আলাদা করে দেখছি? কেনইবা স্পেশাল করে দেখতে হয়? আমরা কি পারিনা তাদেরকে একই সারিতে সমানভাবে
ভাবতে?

সমস্যাটা হলো মানুষ এখনো তাদেরকে; চ্যারিটি মডেলে; দেখতে পছন্দ করে, অর্থাৎ সহানুভূতি দেখিয়ে সাময়িক কিছু সাহায্য-সহযোগিতা করে আমাদের দায়িত্বটা শেষ করতে চায়। আমরা এখনো তাদেরকে; সোশ্যাল রাইটস; মডেলে দেখতে শিখিনি। যেখানে একজন মানুষ হিসেবে তার সকল চাহিদা, অধিকার, সুরক্ষা অন্যদের মতোই পেয়ে থাকবে।





প্রতিবন্ধীতাতো সৃষ্টির একটি বিচিত্র মাত্র। কেউ ফর্সা, কেউ শ্যাম বর্ণের হয়ে জন্ম নিলে আমরা যেভাবে সহজে মেনে নিতে পারি, সেভাবে কেন একজন ব্যক্তি কোন অঙ্গে ত্রুতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করলে তাকে মেনে নিতে পারছিনা? 

খেলার মাঠেও একজন প্রতিবন্ধী ব্যাক্তি আমার সঙ্গী হতে সমস্যা থাকবে কেন?বন্ধুদের মধ্যে একজন দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী বন্ধু থাকলে অন্যরা নাক ছিটকাবে কেন? এ সমাজে এখনো বোনের বিয়ের পাত্র দেখতে আসলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভাইকে ঘরের এককোনে দরজা বন্ধ করে রাখা হয়, সকল যোগ্যতা থাকার পরও চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে না দেয়ায় আইনের দ্বারস্থ হতে হয়, দুহাত না থাকা প্রতিবন্ধী মেয়েকে ধর্ষনের স্বীকার হতে হয়, কথা বলতে না পারা বাক প্রতিবন্ধী বাবাকে ছেলেধরা সন্দেহে গনপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়, সে সমাজে আমরা প্রতিবন্ধী একজন মেয়ের বিয়ের কথা সহজে ভাবতে পারি? দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কোনো ছাত্রের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে বিদেশ গমনের কথা ভাবতে পারি? নাকি পারি একজন নীতিনির্ধারণি পর্যায়ে কোনো প্রতিবন্ধী মানুষকে দেখতে?

তাহলে এ সমাজে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে কী করে? শুধু কি বাসে কয়টা সীট আর কয়টাকা ভাতা দিলেই তাদের জীবন কেটে যাবে? না, ঘুরে দাঁড়াবার সময় এসেছে। পরিবর্তন আবশ্যম্ভাবী। সমাজের মানুষ ইতিবাচক মনোভাব পোষন করতে শিখবে। যদি আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে নিজেদের মনোভাবটা আগে পরিবর্তন করি। তাদেরকে খুব আলাদা করে না দেখে তাদের অধিকার ও ক্ষমতায়নের ব্যাপারে নিজে সচেষ্ট হই, অন্যদের জাগিয়ে তুলি। পরিবর্তন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, আমরা সুমাইয়া, চিবল, হৃদয়, ফাল্গুনীদের সাফল্যগাথা গল্প শুনেছি। এছাড়াও বহু জলন্ত উদাহরণ রয়েছে আমাদের সামনে যেগুলো আমাদের বিশ্বাস করাতে শেখায়, প্রতিবন্ধীতা মানে প্রতিভাবন্ধী নয়।

মিছবাহুল আলম
ডেপুটি টীম লিডার, ইয়ুথ নেট
ফিজিক্যালি-চ্যালেঞ্জড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (পিডিএফ)


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60, Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft