For English Version
বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯
হোম অনলাইন স্পেশাল

জরিমানা-মামলা দিয়েও থামছে না অবৈধ গ্যাসের ব্যবহার

Published : Tuesday, 5 November, 2019 at 5:14 PM Count : 50
ফয়সাল আহমেদ

গাজীপুরে শিল্প কারখানার সঞ্চালন লাইন থেকে অবৈধভাবে বাসা-বাড়িতে আবাসিক কাজে গ্যাসের ব্যবহার শুরু হয় সেই ২০১৫ সাল থেকে। সরকারি এই সম্পদের ইচ্ছেমত ব্যবহার বাড়ছে প্রতিদিন। সীমিত লোকবল দিয়ে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, জরিমানা ও মামলা দিয়েও কোন ভাবেই রোধ করতে পারছে না অবৈধ গ্যাসের ব্যবহার।

এতে একদিকে চোখের সামনেই ধ্বংস হচ্ছে রাষ্ট্রীয় এই সম্পদ অন্যদিকে অবৈধ গ্যাসের জাল সকল এলাকায় বিস্তার হওয়ায় গাজীপুরবাসীর বসবাস এখন অনেকটা জলন্ত অগ্নিকাণ্ডের ওপর।

গাজীপুর তিতাস গ্যাস অফিসের তথ্যমতে, গাজীপুর একটি শিল্প সমৃদ্ধ এলাকা। এই জেলার সকল এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শিল্প কারখানা। সরকার শিল্প কারখানার স্বার্থেই কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করেছে। এই সুযোগটি গ্রহণ করেছে স্থানীয় দালাল চক্র। তারা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নামফলক ব্যবহার করে রাতের আঁধারে হাজারের পর হাজার কিলোমিটার অপরিকল্পিতভাবে নিম্নমানের পাইপ দিয়ে লাইন টেনেছেন। এরপর টাকার বিনিময়ে বাসা-বাড়িতে সংযোগ দিচ্ছেন। সরকারি এই সম্পদ রক্ষায় সীমিত লোকবল নিয়ে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় গত দুই মাসে জেলায় ৬৮ কিলোমিটার এলাকার অবৈধ গ্যাস পাইপ লাইন অপসারণ করে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। এ সময় ৪১২টি বাড়ির ৯ হাজার ৪২০টি চুলা, ৬টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। জব্দ করা হয় ৫ হাজার ৭০ মিটার পাইপ। অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় ৬টি ও জরিমানা আদায় করা হয় ১৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা। তবে বর্তমানে গলার কাঁটা হয়ে দাড়িয়েছে একদিকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর ফের দালাল চক্রের সংযোগ দেয়ার ঘটনা। 

গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর এলাকার কেওয়া ও উজিলাব গ্রামে স্থানীয় ৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কামরুজ্জামান কামালের নেতৃত্বে এই ওয়ার্ডের সর্বত্রই গ্যাসের পাইপের জাল বিস্তার করা হয়। পরে চলতি বছর দু'বার এই লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর শেষ বার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর ফের এই লাইনে আবার সংযাগ দেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা লোকমান হোসেন আকন্দ ও ফারুক হোসেন ভাঙ্গী।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ লোকমানসহ অবৈধ সংযোগ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

কেওয়া পূর্ব খন্ড এলাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ওমেদ আলীর নেতৃত্বে এলাকায় কয়েক হাজার বাড়িতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়। গ্যাসের ব্যবসা করে ওমেদ আলী এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। গত ৩১ অক্টোবর এই এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত উমেদ আলীকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করেন।

শ্রীপুরের গাজীপুর ইউনিয়নের নগরহাওলা, জৈনা বাজার, তরমুজপাড়া, উত্তর গাজীপুর, ডংপাড়া এলাকায় অবৈধ গ্যাসের বিস্তার করেছেন গাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদ্য আওয়ামী লীগে যোগদান করা আবুল হাসেম। এখন এই এলাকা থেকে নিয়মিত চুলা বাবদ ভাড়া আদায় করার অভিযোগ রয়েছে কয়েকজন প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে।

শ্রীপুর পৌর এলাকার কেওয়া বেপারীপাড়া ও বকুলতলা এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে শ্রমিকলীগ নেতা জালাল উদ্দিন কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

শ্রীপুর পৌর এলাকার শুধু শ্রীপুর ও লোহাগাছ গ্রাম বাদ দিয়ে প্রতিটি এলাকায় রয়েছে অবৈধ গ্যাসের বিস্তার।  ভাংনাহাটি, চন্নপাড়া, গিলারচালা, লিচু বাগান, মাষ্টারবাড়ী ফখর উদ্দিন টেক্সটাইল মিল এলাকা, বহেরারচালা, কেওয়া পূর্বখন্ড, কেওয়া পশ্চিম খন্ড, বৈরাগীর চালা তোলিহাটি ইউনিয়নের মুলাইদ, টেপিরবাড়ী, আবদার রাজাবাড়ী এলাকার পুরোটাই রয়েছে অবৈধ গ্যাসের ওপর।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর গাজীপুর সদর উপজেলার অবৈধ গ্যাসের লাইন থেকে ভাওয়াল মির্জাপুর কলেজের একটি কক্ষে আগুন ধরে। পরে এই এলাকায় অভিযান চালিয়ে এলাকার অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ ঘটনায় অবৈধ সংযোগ গ্রহণ ও অন্যান্যদের সহায়তার দায়ে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ভাওয়াল মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন দুলাল ও তার সহযোগীদের অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করে তিতাস কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনার পর ফের এই এলাকায় গ্যাসের সংযোগ পুনঃস্থাপিত করা হয়।

এছাড়াও, গাজীপুর সদর থানার হোতাপাড়া, ভবানীপুর, রাজেন্দ্রপুর ও ভাওয়াল মির্জাপুর, বাংলাবাজার এলাকায় বাড়িতে বাড়িতে রয়েছে অবৈধ গ্যাসের সংযোগ। গাজীপুর সিটি এলাকার সালনা পশ্চিম পাড়া, মোল্লাপাড়া, দেশী পাড়া, কুনিয়া, বোর্ডবাজার, টেকনগপাড়া, বিআরটিসি গেইট সংলগ্ন এলাকা, মারিয়ালী, চাপুলিয়া, পুবাইল, কোনাবাড়ী, আমবাগ, টঙ্গী, উত্তর বারবৈভা এলাকায় বিস্তার হয়েছে অবৈধ গ্যাসের জাল।

অবৈধ গ্যাস ব্যবহারে নিরাপদ শ্রীপুরের অর্ধেক এলাকা
গাজীপুর ও ময়মনসিংহ জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা শ্রীপুর। এই উপজেলার শুধু শ্রীপুর পৌরসভার কয়েকটি গ্রামের নজরদারী করে গাজীপুর তিতাস গ্যাস অফিস। বাকি পুরোটাই নজরদারী করার কথা ময়মনসিংহ তিতাস গ্যাস অফিসের। গাজীপুর অফিস তার সীমানার বাইরে নজরদারী না করা ও ময়মনসিংহ অফিস গাজীপুর জেলায় না আসার কারণে এখন নিরাপদে বছরের পর বছর অবৈধ গ্যাস ব্যবহার করছে শ্রীপুরের কেওয়া পশ্চিম খন্ড, তেলিহাটি, গাজীপুর ইউনিয়নের জৈনাবাজার, নয়নপুর, এমসিবাজার এলাকার কয়েক হাজার গ্রাহক। 

কিভাবে লাগে সংযোগ
প্রথমে এলাকার অবৈধ সংযোগ প্রত্যাশীদের সংগঠিত করেন এলাকার দালাল চক্র। এখানেই জড়িত হয়ে পড়েন স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। এরপর গ্রাহকপ্রতি উঠানো শুরু হয় টাকা। প্রতিটি সংযোগ প্রত্যাশীদের কাছ থেকে নেয়া হয় ৫০ থেকে এক লাখ টাকা। পরে ম্যানেজ করা হয় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে। স্থানীয় দোকান থেকে কেনা হয় পাইপ ও রাইজার। চুক্তি করা হয় ওয়ার্কশপের কারিগরদের সঙ্গে। রাতের বেলায় সড়ক খুড়ে পাইপ বসিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। পরে সুবিধাজনক কোন এক সময়ে শিল্পকারখানার সঞ্চালন লাইনের পাইপে ফুটো করে ঝালাই দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে সংযোগ দিয়ে দেয়া হয়। এভাবেই শুরু হয় দিনের পর দিন রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার। 





প্রতিনিয়ত লোকজন অবৈধ সংযোগের দিকে ঝুঁকছে
শিল্প এলাকার গাজীপুরে কোটি মানুষের বসবাস। প্রতিনিয়ত মানুষের চাপ বেড়েই চলছে এ জেলায়। বিপুল এই মানুষের থাকার জন্য ভাড়া বাসা অন্যতম ভরসা। আর গ্যাস সংযোগের বাসাগুলোর কদরও ভাড়াটিয়াদের কাছে বেশি। লাভের দিক ও বাসার কদর বিবেচনা করেই বাসার মালিকরা অবৈধ সংযোগ নিয়ে থাকেন। এতে একদিকে একবার খরচ করে সংযোগ দিলে চলা যায় মাসের পর মাস। দিতে হয় না কোন ধরনের বিল। পরে তিতাস কর্তৃপক্ষ এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরও ফের ঝুঁকি নিয়েই বাসা-বাড়ির মালিকরা আবার সংযোগ পুনঃস্থাপন করেন। 

তৈরি হচ্ছে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি
অবৈধ গ্যাসের কারণে গাজীপুরবাসীর বসবাস এখন জলন্ত অগ্নিকাণ্ডের ওপর। মাটি খুড়লেই মেলে গ্যাসের পাইপ। নিম্নমানের সামগ্রী, কোন ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই এসব পাইপ লাইন স্থাপন করায় বিস্ফোরণ ঘটার আশংকা রয়েছে। লাইন নির্মাণ সহজলভ্য করতে থ্রেট পাইপ (প্লাষ্টিক) দিয়ে সংযোগ অব্যাহত রয়েছে। শিল্প কারখানার সঞ্চালন লাইনে সরবরাহকৃত গ্যাসের চাপ থাকে খুব বেশি (১.৪০)। এই লাইনের গ্যাস আবাসিকে রান্নার কাজে ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। তবে অপরিকল্পিতভাবে পাইপ ফুঁটো করে আবাসিকে সরবরাহ করায় যেকোন সময় ঘটতে পারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ।

গাজীপুর তিতাস গ্যাস অফিসের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী অজিত চন্দ্র দেবনাথ বলেন, 'কয়েক বছর ধরেই নানা ভাবে রাতের আঁধারে গাজীপুরের প্রতিটি এলাকায় অবৈধ গ্যাসের বিস্তার ঘটেছে। শিল্প কারখানার সঞ্চালন লাইন অপরিকল্পিতভাবে ফুঁটো করে অবৈধ গ্যাসের সংযোগ নেয়ায় একদিকে পাইপ লাইনের ক্ষতি হচ্ছে অপরদিকে রাষ্ট্রীয় এই সম্পদের অপচয় হচ্ছে। এসব ছাড়িয়েও সবচেয়ে বড় হয়ে সামনে আসছে দুর্ঘটনার আশংকার বিষয়টি। গত কয়েক মাস ধরেই তিতাস কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসনের সহায়তায় সীমিত জনবল নিয়ে বিশাল এলাকায় অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ অভিযান পরিচালনা করছে। যা অব্যাহত আছে।'

-এমএ


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60, Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft