For English Version
বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
হোম অনলাইন স্পেশাল

সকল সমস্যার সমাধান দেন জ্যোতিষ সুকুমার

Published : Sunday, 18 August, 2019 at 3:17 PM Count : 201
শহীদুল ইসলাম শহীদ

গণক ও তান্ত্রিকতার নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে যুগ যুগ ধরে চলছে প্রতারণার ব্যবসা। সব সমস্যার সমাধান আর জটিল সব রোগের দাওয়াই নাকি দিতে পারেন জ্যোতিষ সুকুমার। এমন বিজ্ঞাপনে দূর দূরান্ত থেকে যাচাই করতে এসে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষেরা। লোক ঠকিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কথিত জ্যোতিষ ও তান্ত্রিক সুকুমার।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালীরাও তার এই প্রতারণা ব্যবসায় আড়াল থেকে শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছেন। বছরের পর বছর এভাবে প্রতারণার ব্যবসা চালিয়ে গেলেও প্রশাসনকে কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। 

দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাহার বাজার থেকে কয়েকশ গজ ভেতরেই কথিত জ্যোতিষ ও তান্ত্রিক সুকুমারের সুদৃশ্য বাড়ি। বাড়ির সামনে কীর্তনের সুদৃশ্য ঘর ও কালী মন্দির। দাদা থেকে বংশ পরম্পরায় তারা এই গণক ও তান্ত্রিকতার ব্যবসা করে আসছেন। স্থানীয়দের কাছে সুকুমার মাহান, তান্ত্রিক, জ্যোতিষ ও গণক বলে পরিচিত। 

স্থানীয়রা জানায়, ১০ বছর আগেও সুকুমারের বাড়িতে বাঁশের চাটাইর বেড়ার ঘর ছিল। এখন তার ঘরবাড়ি দেখলেই অনুমান করা যায় ব্যবসা ভালই জমে উঠেছে। দূর দূরান্ত থেকে নানা সমস্যা ও জটিল অসুখ নিয়ে তার কাছে আসছেন অনেকেই। আর তাদের জিম্মি করে কৌশলে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসা লোকদের ভাগ্য গণনা ও সমস্যার সমাধান দিতে বসেন সুকুমার। শুরুতে রোগীকে মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলেন এই চৌকষ গণক। পরে আসেন চিকিৎসাতে। দর্শন ফি ১১০ টাকা। আর চিকিৎসা ব্যয় হিসেবে পরে জন প্রতি ৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন সুকুমার। রোগীদের মগজ ধোলাই করে জটিল রোগ, পারিবারিক ও দাম্পত্য অশান্তিসহ সব সমস্যার দাওয়াই দেন সুকুমার। টাকা পেলে জ্বীন ভূতের আছরও ছাড়িয়ে দেন তিনি। 

সরেজমিনে জানতে গেলাম সুকুমারের বাড়িতে। সে দিন ছিলো শনিবার। বেলা ১২টায় পৌঁছালাম সুকুমারের বাড়িতে। আগে থেকেই দূর দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ এসেছেন সুকুমারের দাওয়াই নিতে। অনেকেই ভোর থেকে অপেক্ষা করছেন। দূরের ভক্তদের থাকার জন্য আশ্রমও করেছেন তিনি।

দুই কক্ষ বিশিষ্ট অন্ধকার প্রায় একটি বদ্ধ ঘরে আগত মানুষের ভাগ্য গণনা করছেন সুকুমার। ঘরে ঢুকেই দেখা গেলো একটি উঁচু আসনে বসে টাকা গুণছেন এক ব্যক্তি। সাদা ধুতি, গেরুয়া পাঞ্জাবী আর সংস্কৃত স্লোক লেখা একটি চাদর পড়ে আছেন তিনি। তিনি আর কেউ নন এলাকার প্রভাবশালী জ্যোতিষ সুকুমার চন্দ্র।

গণমাধ্যমকর্মী পরিচয় পেয়েই আমতা আমতা শুরু করেন তিনি। সুকুমার চন্দ্র প্রথমে নিজেকে জ্যোতিষি দাবি করলেন। খানিক পরেই নিজেকে তান্ত্রিক ও কালি সাধক বলে পরিচয় দিলেন। মাধ্যমিকের গন্ডি পার হননি বলেও স্বীকার করে সুকুমার। 

জানালেন, দাদা লক্ষ্মীকান্ত থেকে তাদের এই ব্যবসার শুরু। পিতা চন্দ্রকান্তও নাকি জ্যোতিষ ছিলেন। অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপিও নাকি তার ভক্ত। চার পাঁচজন সেবকও আছে তার। 

রোগীদের নিকট থেকে ফি নিয়ে সিরিয়াল দেয়ার কাজে নিয়োজিত ঈশ্বর চন্দ্র জানান, শনিবার আর মঙ্গলবার রোগী দেখেন সুকুমার। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ আসেন। কেউ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে, কেউ পারিবারিক অশান্তি, কেউ সন্তানের আশায়, আবার কেউ জ্বীন ভূতের আছর ছাড়াতে আসেন। দূরের রোগীদের জন্য আশ্রমেই থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। 

বাইরে অপেক্ষমান কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে সুকুমারের লোকজন বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করে।
 
স্থানীয়রা জানায়, সুকুমার তেমন কিছুই জানেন না। গায়ে সংস্কৃত ভাষার লিখিত চাদর পড়ে গুটি কয়েক মন্ত্র আর সংস্কৃত স্লোক দিয়ে মানুষের মগজ ধোলাই করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করেই দিনের পর দিন এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন সুকুমার। এক দশকে এই ব্যবসায় সুকুমার কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। 

পঞ্চগড় জেলা শহরের বাসিন্দা সুফিয়া খাতুন বলেন, ‘আমি আমার নাতনিকে সুকুমারের কাছে নিয়ে গেছিলাম। রোগ সারাতে পারেনি। অথচ রোগ সারানোর নাম করে নানা ছলে কলে আমাদের থেকে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।’ 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী জানান, ‘আমি দু'বার সুকুমারের কাছে গিয়েছি। ১৪ হাজার টাকা নিয়েছে। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। আশ্রমে থাকা নারীদের সঙ্গে সুকুমার অসৌজন্য আচরণ করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।’ 

ঠাকুরগাঁও থেকে আসা রচনা রায় বলেন, ‘মায়ের নাম করে প্রথমে দর্শন স্বরূপ ১১০ টাকা নেয়। তারপর রোগ ও সমস্যা অনুযায়ী চিকিৎসা বাবদ যার কাছে যেমন পারে নেয়। আমার কাছে ১২ হাজার টাকা নিয়েছে।’

সোনাহার এলাকার বসন্ত কুমার জানান, কয়েক বছর আগেও সুকুমারের বাড়িতে ছিলো বাঁশের চাটাইয়ে বেড়া। এখন অনেক উন্নতি করেছে। তবে কি পরিমাণ অর্থের মালিক সে তা আমরা জানি না।’ 

দেবীগঞ্জের গজপুরী এলাকার মামুন শাহ বলেন, ‘আমার ভাই হারিয়ে গেলে আমি মায়ের পীড়াপিড়িতে সুকুমারের কাছে গিয়েছিলাম। সুকুমার আমাদের জানালো আমার ভাই ঢাকা যাচ্ছে। যমুনা সেতু পার হচ্ছে। অথচ নীলফামারী গিয়ে দেখি আমার ভাই ইপিজেডে চাকরির জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছে। আসলে সুকুমার একটা ভন্ড জ্যোতিষ। এভাবে সহজ সরল মানুষকে ঠকিয়ে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে। প্রশাসনও কোন ব্যবস্থা নেয় না।’  

দেবীগঞ্জের কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সুকুমার গুটি কয়েক সংস্কৃত স্লোক বলে ঝাঁড়, ফুক দিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। স্থানীয়রা তার কাছে যায় না। দূরের যারা আসে তারা এক বার প্রতারণার শিকার হওয়ার পর আর আসেন না। তার সঙ্গে স্থানীয় অনেক প্রভাবশালী জড়িত রয়েছে। এ জন্য তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলে না।’

সোনাহার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজ্জাক দুলাল বলেন, ‘মানুষ অনেক সময় মানসিক অশান্তিতে ভোগে। একটা সময় তা এমনিতেই ভাল হয়ে যায়। কিন্তু তারা মনে করে সুকুমারের কাছে গিয়েই ভাল হয়েছে। এটা কুসংস্কার ছাড়া কিছু না।’

এ বিষয়ে সুকুমার বলেন, ‘আমি মায়ের সেবক। মায়ের নাম করে মানুষের সেবা করি। বড় বড় মন্ত্রী, এমপিরা আমার ভক্ত। ভাল হয় বলেই মানুষ আসে। আপনারা যা পারেন করেন। কেউ আমার কিচ্ছু করতে পারবে না।’ 

জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘সোনাহারের জ্যোতিষ সুকুমারের প্রতারণার অনেক অভিযোগ জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় তোলা হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে খতিয়ে দেখার নির্দেশনা দিয়েছি। অভিযোগের সত্যতা পেলে তার বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

-এসআইএস/এমএ


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60, Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft