For English Version
সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
হোম অর্থ ও বাণিজ্য

চামড়ার দরপতনে লোকসানে সিরাজগঞ্জের ব্যবসায়ীরা

Published : Wednesday, 14 August, 2019 at 2:10 PM Count : 57

সিরাজগঞ্জে কোরবানির পশুর চামড়ার ব্যাপক দরপতন হয়েছে। ৬০ হাজার টাকা দামের গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৩০ টাকা দরে। যা সরকার নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে কোন মিল নেই। পশুর চামড়ার দাম একেবারেই কম বলা চলে। যারা পশু কোরবানি দিয়েছেন তারা যেমন চামড়ার দাম পাননি, তেমনি মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও দাম পাচ্ছেন না।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন চামড়া সংগ্রহ করবে আরও ১০ থেকে ১২ দিন পর। ওই সময় পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা যদি এ চামড়া সংরক্ষণ করতে পারেন, তাহলে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি করতে পারবেন। না হলে তাদের পরিণতি হবে আরও ভয়াবহ। নিকট ভবিষ্যতে এমন অনিশ্চয়তা দেখে এখনই মাথায় হাত পড়েছে চামড়া ব্যবসায়ীদের। বিশেষ করে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ বলছেন, পুঁজি সংকটে সিরাজগঞ্জের আড়তদাররা চামড়া কিনতে পারছেন না। এছাড়া সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম একবারেই কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ওপর আবার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে ইচ্ছে দামে চামড়া কিনেছেন। 

বিভিন্ন এলাকার চামড়ার অস্থায়ী বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, কোরবানির গরুর প্রতি পিস ছোট চামড়ার দাম ১শ থেকে ২শ টাকা, মাঝারি আকারের প্রতিটি চামড়া ২শ থেকে ৪শ টাকা এবং বড় চামড়া ৫শ থেকে সর্বোচ্চ ৬শ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর বকরি ও খাসির চামড়া বিক্রি না হওয়ায় অনেকে ফেলে দিয়েছেন।

তবে এ দাম গত বছরের তুলনায় তিন-চার গুণ কম। তবে ঈদের দিন বিকেল থেকে আর চামড়া ক্রয় করা হয়নি। যে কারণে অনেকের চামড়া নষ্ট হয়েছে। আবার অনেকে চামড়া পানির দরে বিক্রি করেছেন। 

এমন অভাবনীয় দর পতনে হতাশ কোরবানী দাতা ও চামড়া ব্যবসায়ীরা।

সোমবার জেলার বৃহৎ চামড়ার মোকাম শহরের নিউঢাকা রোডের চামড়া পট্টিসহ জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, যারা কোরবানি দিয়েছেন তারা কাঁচা চামড়া বিক্রির লোক খুঁজে পাচ্ছেন না। যারা বিক্রি করতে পেরেছেন তারাও নামমাত্র দাম পেয়েছেন। আবার অনেকে কাঙখিত দাম ও ক্রেতা না পেয়ে মাদরাসা ও এতিমখানার লোকজনকে বিনা পয়সায় দিয়ে দিচ্ছেন। ছাগলের চামড়া কেউ ক্রয় করছেন না। 

শহরের চামড়া পট্টিতে গিয়ে দেখা যায়, শত শত ছাগলের চামড়া পড়ে আছে। কোরবানী দাতারা এগুলো ফেলে রেখে গেছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

এদিকে, চামড়ার বাজার ধসের কারণ সম্পর্কে ব্যবসায়ীরা জানান, চামড়ার বাজার বছর বছর কমে আসছে। এবার আরও কমে এসেছে। এর প্রধান কারণ জেলার বড় ও মাঝারি অনেক ব্যবসায়ীর কোটি কোটি চামড়ার বকেয়া টাকা ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে পড়ে রয়েছে। এসব বকেয়া টাকা বছরের পর বছর আটকে থাকায় সিরাজগঞ্জের ব্যবসায়ীরা মারাত্মক পুঁজি সঙ্কটে পড়ে অসহায় হয়ে রয়েছেন। তাই জেনে বুঝে ব্যবসায়ীরা আর লোকসান দিতে রাজি নন। যে কারণে চামড়ার ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছে বলে তারা মনে করেন।  

সিরাজগঞ্জ পৌর শহরের সয়াগোবিন্দ মহল্লার একরামুল হক জানান, দুটি ছাগল তিনি ৩২হাজার টাকায় ক্রয় করে কোরবানী দিয়েছেন। ছাগলের চামড়া ক্রয় করার কোন লোক না পেয়ে চামড়া পট্টিতে ফেলে দিয়ে এসেছেন।

পৌর শহরের ব্যাপারী পাড়া মহল্লার মো. লুৎফর রহমান জানান, তিনি এক লাখ টাকায় গরু কিনে কোরবানী দিয়েছেন। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোন ক্রেতা তার চামড়া ক্রয় করতে যায়নি। উপায় না পেয়ে মঙ্গলবার চামড়া পট্টিতে বিক্রি করতে আসলে তারা কেও ক্রয় করবে না বলে জানায়। 

তিনি  আরও জানান, সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করেছে যদি এই দামে চামড়া বিক্রি করা যেত, তাহলে আমার কোরবানির গরুর চামড়ার দাম কম করে হলেও ১ হাজার ২শ থেকে ১ হাজার ৪শ টাকা হতো। কিন্ত কেউ দামই বলছে না। এখন মাটিতে পুতে ফেলা ছাড়া উপায় নেই। 

সদর উপজেলার মেছড়া ইউনিয়নের ঘাটিয়া গ্রামের আব্দুল আওয়াল জানান, তিনি বাড়িতে বড় একটি ষাঁড় কোরবানী দিয়েছেন। বাজারে তার দাম ৬০-৭০ হাজার টাকা। সেই গরুর চামড়া বিক্রি করেছেন মাত্র ৩০ টাকায়। তাও ক্রয় করতে চায়না। 

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের দেশে কিছু মুনাফাখোর ব্যবসায়ী রয়েছে, যারা সুযোগ পেলেই মানুষের পকেট কাটে। কোরবানির চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়ে তারা গরিবের হক মারছে। আর সরকার এসব দেখে চুপ করে বসে আছে, কিছুই বলছে না। উল্টো বিভিন্ন ভাবে মুনাফাখোর ও লুটেরাদের সুযোগ করে দিচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

রায়গঞ্জ উপজেলার পাঙ্গাসী গ্রামের চামড়া ব্যবসায়ী হারান চন্দ্র দাস বলেন, 'চামড়া এতো তুচ্ছ হয়ে গেছে যে মাঠে ঘাটে রাস্তায় চামড়া গড়াগড়ি যাচ্ছে, কেউ নিচ্ছে না।'

তিনি আরও বলেন, '৪শ থেকে ৬শ টাকা দরে ২৭৫টি গরুর চামড়া ক্রয় করেছেন সেই চামড়া গড়ে ২শ টাকা দরে বিক্রি করেছেন তাও বাকিতে। টাকা কবে পাবো জানি না। এতে করে তিনি বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন। তার ২০ বছরের ব্যবসা জীবনে চামড়ার এতবড় দরপতন হয়নি।' এবার চামড়ার বাজার দর পড়ে যাওয়ার রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

চামড়া ব্যবসায়ী হাসিনুজ্জামান বলেন, 'এবার চামড়ার দাম গত বছরের তুলনায় অনেক কম। সরকার চামড়ার যে দাম নির্ধারণ করেছে, সেটি ঠিক হয়নি। আমরা চামড়া কিনবো টাকা কোথায়। ঢাকার মালিকরা বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা আটকে রেখেছেন দিচ্ছেন। নিজেদের যে সামর্থ আছে তা দিয়েই চামড়া ক্রয় করছি। এছাড়া, ঢাকার ব্যবসায়ীরা চামড়া ক্রয় করছেন না তাহলে আমরা চামড়া কিনে কি করবো। সরকারের কাছে আমাদের দাবি ট্যানারি মালিকরা আমাদের টাকা বাকি রাখেন, আমাদের সেই টাকার পাশাপাশি তারা ব্যাংক ঋণ পান। তাদের সেই টাকা কোথায় যায়? সেটির খোঁজ নেওয়া দরকার।'

চামড়ার দাম গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক কম স্বীকার করে চামড়া ব্যবসায়ী ও সিরাজগঞ্জ চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির অন্যতম সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, পুঁজির অভাবে আমরা চামড়া কিনতে পারছি না। তারপরেও বিভিন্ন  উৎস থেকে টাকা যোগাড় করে কিনছি। সরকার নির্ধারিত দামের থেকে প্রতি ফুট আমরা ১০ টাকা কমে চামড়া কিনেছি। কারণ সরকার লবণ চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। টাকা থাকলে চামড়া কেনার প্রতিযোগিতা হয়, ফলে দামও বেড়ে যায়। টাকা না থাকায় কোনো প্রতিযোগিতা নেই। তাই চামড়ার দাম কমেছে।

তিনি আরও বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে শুধুমাত্র সিরাজগঞ্জের ব্যবসায়ীদের প্রায় ১০০ কোটি বকেয়া রয়েছে। তারা আমাদের ঈদের আগে বকেয়া পরিশোধ করলে এমন পরিস্থিতি হতো না। আমরা প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ীরা চামড়া না কিনতে পাড়ার কারণে মাঝখান থেকে একটি চক্র টাকা হাতিয়ে নিয়ে যাবে। ট্যানারি মালিকরা ব্যাংক ঋণ এবং সরকারের কাছ থেকে নানা প্রণোদনা পান। তারপরও তারা আমাদের টাকা বকেয়া রাখেন। আমরা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছি। তাদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে, তারা সব লেনদেন বন্ধ করে দেন। সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ একটি টাস্কফোর্স গঠন করে চামড়া নীতি প্রণয়ন করে এ সমস্যার সমাধান করা হোক। 

জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস জানিয়েছে, এ বছর জেলায় এক লাখ ১০ হাজার কোরবানী দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার গরু বাকিগুলো ছাগল, ভেড়া  ও অন্যান্য প্রাণী।

-এবি/এমএ


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60, Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft