For English Version
সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
হোম

ডেঙ্গু আতঙ্ক নয়, চিকিৎসা নিন

Published : Friday, 26 July, 2019 at 7:33 PM Count : 75

দেশে ডেঙ্গু আতঙ্ক বাড়ছে। এর আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। কোনও কোনও পরিবারের একাধিক সদস্য ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। রাজধানীসহ দেশের বেশির ভাগ সরকারী-বেসরকারী হাসপাতালে পা ফেলার জায়গা নেই।  নির্ধারিত বেড ছাড়িয়ে ফ্লোরে, বারান্দায়, লিফটের পাশে, বাথরুমের দরজার সামনে অবস্থান নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (২৫ জুলাই) ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৫৪৭ জন। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১ জন। এর মধ্যে চট্রগ্রামে ৯ জন, খুলনায় ও বরিশালে ১ জন করে।

এ পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ২৫৬ জন। ঢাকার ভেতরে ঢামেক হাসপাতালের নতুন ভবনের ৪, ৫ ও ৬ তলায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এই হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১১২। এছাড়া মিটর্ফোড হাপসাতালে ৫৮ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৬৩, শিশু হাসপাতালে ২৭, হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ৩২, বারডেমে ১০, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ১৮, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৪২ এবং বিজিবি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৭ জন।

এছাড়া ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গত ২৪ ঘণ্টায় (২৫জুলাই) ভর্তি হয়েছেন ১৬৭ রোগী। আর বেরসকারি ৩৬টি হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি আছেন ৯৩১ জন। বেসরকারি হাসপাতালে এ পর্যন্ত ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৪৭৫ জন। চিকিৎসা নিয়ে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৩ হাজার ৫৩৭ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে তারা ‘মহামারি’ না বললেও পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর। আর যত রোগী হাসপাতালগুলোতে আসছেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের তালিকাভুক্ত হচ্ছেন, প্রকৃত সংখ্যা তার অনেক বেশি। কোনও কোনও হাসপাতালে রোগীদের অপেক্ষায় থাকতে বলা হয়েছে। কোথাও কোথাও বেড না থাকায় কর্তৃপক্ষ রোগীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে।

ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচাল ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী বলেন, এবার ডেঙ্গুর নতুন একটা চিত্র দেখতে পাচ্ছি। প্রচুর রোগী ভর্তি হচ্ছে। মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত। অসুখের থেকেও বেশি মানুষ আতঙ্কিত। এবারের ডেঙ্গুর প্যাটার্নটা একটু আলাদা। ডেঙ্গু জ্বর মানেই যে শুধু জ্বর, মাথা ব্যাথা, শরীরের চারিদিকে ব্যাথা বা গায়ে রেস, এবার কিন্তু তা নয়। এবার দেখা যাচ্ছে আমাদের কাছে যে রোগীগুলো ভর্তি হচ্ছে তারা কমপ্লিকেশন নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। অনেক রোগি পথে পথে রিফিউজ হয়ে আমাদের কাছে আসছে তখন আমাদের কিছুই করার থাকে না। কারণ তারা ডেঙ্গু স্বক্ট সিন্ডোমের সঙ্গে মাল্টি অর্গান ফেইলর হয়ে আমাদের কাছে আসছে। এদের ক্ষেত্রে অনেক সময় আমাদের কিছুই করার থাকে না। কিন্তু যেসব রোগী আমাদের কাছে প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপে চলে আসছে তারা সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফিরছে। আজকে আমাদের এখানে ৬০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে।

তিনি বলেন, জ্বলাবদ্ধতা এলাকায়, স্বচ্ছ পানিতে এবং এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র থেকে ডেঙ্গুর বিস্তার হচ্ছে। মানুষ যদি আরও সচেতন না হয় একা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। ডেঙ্গুকে আপনি, আমি, আমাদের পরিবারের সবাই মিলে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

ডেঙ্গুতে স্কুলের বাচ্চারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ৬ বছর থেকে ১০ বছরের বাচ্চারা স্কুলে গেলে হয়তো মশার কামড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যে কেউ আক্রান্ত হলেই যে প্রথম দিনেই ডাক্তারের কাছে যাওয়া চিকিৎসা নেই না। এক, দুই দিন পর দেখার চেষ্টা করি। কিন্তু এবারে মূল ক্ষতিটাই হচ্ছে এটা। একদিন পরেই দেখা যাচ্ছে তার রক্তের চাপ বেড়ে যাচ্ছে, কিডনি খারাপ হয়ে যাচ্ছে, লিভার খারা হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের মাল্টি অরগান ফেইলরের রোগী যখন আমাদের কাছে আসছে বিশেষ করে গ্যাসপিং নিয়ে, (অর্থাৎ তার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এমন সময়) ব্ল্যাট পেশার নিয়ে। তখন তাকে আমি যত উন্নত চিকিৎসাই দেই না কেন, কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের আর বাঁচানো যাচ্ছে না। একটি সুখবর হচ্ছে বেশিরভাগ রোগীই সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফিরছে। আমরা খুব গর্বিত যে এমন ক্রাইসিস মুহুর্তেও সরকারের পাশাপাশি বেসরকারী স্বাস্থ্য থাতের পক্ষ থেকে সহযোগীতা করতে পারছি। আমরা জনসচেতনতার জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের বলে দিচ্ছি, ডেঙ্গুর পরবর্তীতে যা হয় পোস্ট ভাইরাল এস্থেনিয়া (রোগীর দুর্বলতা বাড়ে)। এতে করে রোগী মাথা ঘুরে পড়ে গেল, এতে করে আরও একটা রোগে আক্রান্ত হবে। তাই ডেঙ্গু রোগীকে বেশি করে ফ্রুটস (তরল জাতীয় খাবার) খেতে হবে এবং বিশ্রামে থাকতে হবে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু কিন্ত খুবই সাধারণ রোগ। ডেঙ্গু একটি ভাইরাস জনিত জ্বর। মানুষ যেমন বলে এটা ভাইরাস জ্বর তেমন চিকিৎসা লাগবে না। ডেঙ্গুও একটা ভাইরাস জ্বর। ডেঙ্গুর আবার কয়েকটা প্রকার আছে। যেমন ক্ল্যাসিকেল ডেঙ্গু, হেমারেজিং ডেঙ্গু আরেকটি ডেঙ্গু স্বক্ট সিন্ডোম উইথ মাল্টিপল কমপ্লিকেটস। যখন ডেঙ্গু হেমারেজিং, ডেঙ্গু স্বক্ট সিন্ডোম হয় তখন কিন্তু আমরা ডাক্তারেরা অসহায়। সঠিক সময়ে ডেঙ্গু রোগী খুব কমই আসছে।

যেগুলো ডেঙ্গু ক্ল্যাসিক রোগী তাদের ফ্লুইড ম্যানেজ করলেই সব ঠিক হয়ে যায়। কখনও কখনও ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতালে ভর্তিও হতে হয় না। যদি এমন ডেঙ্গু রোগী আসে যে তার এনএসওয়ান পজিটিভ, মুখে খেতে পারছে, তাকে বলে দেই আপনি চাইলে বাসায়ও থাকতে পারেন। প্যারাসিটামসহ নিয়ম মেনে চললেই সুস্থ্য হয়ে যাবে। তবে যখন রোগী খেতে পারছে না, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে তখন আমরা জাতীয় গাইড লাইনকে অনুসরণ করে ফ্লুইড ব্যালেন্স করছি। আবার যখন কমপ্লিক্যাটেট হয়ে যাচ্ছে তখন তো মাল্টি অর্গান ফেইলরের ক্রিটিক্যাল কেয়ারের ম্যানেজমেন্ট করতে হয়।

এই চিকিৎসক বলেন, রোগীরা যখন অসুস্থ হচ্ছে তখন বুঝতে পারছে না কোথায় যাওয়া উচিত। নিকটতম স্বাস্থ্য কেন্দ্র অথবা যেকোন ডাক্তারের কাছে যেখানে যা পাচ্ছে যাচ্ছে। আসলে রোগীকে এমন একটি হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে যেখানে জীবন বাঁচানোর সকল আয়োজন আছে। তাহলে হয়তো ডেঙ্গু রোগে মৃত্যু ঝুকি কমবে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিয়ে ডেঙ্গুতে এতো আতঙ্কিত হবার কিছু নেই।

ডেঙ্গু রোগের ম্যানেজমেন্ট তো আহামরি কিছু না। মুখে খেতে না পারলে জাস্ট ফ্লুইট (তরল জাতীয় খাবার)খাওয়াতে হবে। এখন যদি সেই ফ্লুইট খাওয়ানোর পরেও রোগীর অবস্থা খারাপ হয় তখন ক্রিটিক্যাল কেয়ার, ভেন্টেলেটর লাগে, মনিটরিংসহ অনেক কিছু লাগে। তবে যখন রোগীর লিভার খারাপ হয়ে যায় তখন সে আর ডেঙ্গু রোগী থাকে না। যখন রোগীর ব্রেইন ইনফেকশন হয়ে যায় তখন এটা এনকাফ্লাইটিস হয়ে যাচ্ছে। কিডনি খারা হয়ে গেলে কিডনি ইনজুরি হয়ে যাচ্ছে। এর সাথে ডেঙ্গুর কোন সম্পর্ক নেই। এর চিকিৎসাও আলাদা। কিন্তু শুধু মাত্র ডেঙ্গুর জন্য আহামরির প্রস্তুতির সুযোগ নেই। এটি একটি সামগ্রিক বিষয় এবং সামাজিক অসুখ। এখানে আমাদের, রাষ্ট্র, সমাজ, নগর, পরিবার, মানুষ সবাইকে পরিবর্তন হতে হবে।

আমাদের নগরকে আরও পরিকল্পিত করতে পারি, জলাবদ্ধতা দুর করতে পারি, মানুষ যদি আরও সচেতন হয়, সবাই যদি ঘরে ঘুমানোর আগে স্প্রে করে রাখে কিংবা নিজের বাড়ি আঙ্গিনা পরষ্কার রাখে তাহলে সহজেই এ রোগ মোকাবেলা করা সম্ভব।

রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল বলেন, ডেঙ্গু একটি স্বাভাবিক রোগের মতই। এটি নিয়ে আতঙ্গের কিছু নেই। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিতে পারলে সহজেই ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগীরা সুস্থ্য হয়ে যায়। ডেঙ্গুর মৃত্যুঝুঁকির মূল কারণ ডেঙ্গুতে রোগীর রক্তনালীর ছিদ্রগুলো বড় হয়ে যায়। সেই ছিদ্র দিয়ে রক্তের জলীয় উপাদান বের হয়ে যায়। ফলে রক্তচাপ কমে। এই অবস্থাকে বলে ডেঙ্গু-শক সিন্ড্রোম। মূলত এটাই ডেঙ্গুর মৃত্যুঝুঁকির মূল কারণ।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগের জন্য বিশেষ কোন হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে না। যে ডাক্তার ডেঙ্গু সম্পর্কে সচেতন বা জানেন এমন ডাক্তারের কাছে সঠিক সময়ে গেলেই সুচিকিৎসা পাবে। ডেঙ্গু হলে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে এমন বাধ্যবাধকতাও নেই। তবে ডাক্তারের পরামর্শে ভর্তি হতে পারে। ডেঙ্গু হলে রোগীকে প্রথমেই সিবিসি এবং প্লাটিলেট টেস্ট করতে হবে। এছাড়া ব্লাড সুগার, লিভারের পরীক্ষা যেমন- এসজিওটি, এসজিপিটি, এলকালাইন ফসফাটেজ ইত্যাদি করাতে হতে পারে। আবার চিকিৎসক যদি মনে করেন রোগী ডিআইসি জাতীয় জটিল কোন সমস্যায় আক্রান্ত সে ক্ষেত্রে প্রোথ্রোম্বিন টাইম, এপিটিটি, ডি-ডাইমার ইত্যাদি পরীক্ষা করাতে হতে পারে।

তিনি বলেন, এসব টেস্ট দেশের যে কোন হাসপাতাল বা ডায়গনিস্টিক সেন্টার থেকে করাতে পারবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের দেশের অনেক ডাক্তারই আছে যারা সঠিকভাবে ডেঙ্গু সম্পরেক সচেতন নয়। তবে ধীরে ধীরে যেহেতু এই রোগটি প্রকট আকার ধারণ করছে তাতে আমাদের দেশের সকল ডাক্তারই এ বিষয়ে সকর্ত এবং সচেতন হবেন। এ বিষয়ে আমাদের ডাক্তারদের কর্মশালাও হয়েছে।

 


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60, Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft