For English Version
সোমবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৯
হোম সারাদেশ

পল্লী বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ ছিড়ে বাবা-ছেলের মৃত্যু

Published : Monday, 22 July, 2019 at 5:57 PM Count : 52
অবজারভার প্রতিনিথি

পঞ্চগড় সদর উপজেলার পানিমাছ পুকুরী আশ্রয়ন প্রকল্পের একটি ঘর থেকে পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামের কয়েকটি বাড়িতে দেওয়া অবৈধ পার্শ্ব সংযোগের (সাইড লাইন) তার ছিড়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে বাবাসহ দুই ছেলের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী স্থানীয় অবৈধ সংযোগ প্রদানকারীদের পাশাপাশি পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন।

শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের মাহানপাড়া এলাকায় বাড়ির পাশের একটি জলাশয়ে জাল দিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে বাবা সহ দুই ছেলে নিহত হয়েছেন।

এ ঘটনায় শনিবার রাতেই পঞ্চগড় জেলা প্রশাসন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসক বরাবরে দাখিল করতে বলা হয়েছে।

এছাড়া শনিবার রাতেই ক্ষতিগ্রস্ত ওই পরিবারটিকে ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসন।

রোবাবার দুপুরে পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের পানিমাছ পুকুরী-মাহান পাড়া ও পানমিাছ পুকুরী আশ্রয়ন প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, বেলা আড়াইটার দিকে বাবা সহ দুই ছেলেকে বাড়ির পাশের মনোহরদিঘী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। নিহতদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে পার্শ্ববর্তী পানিমাছ পুকুরী আশ্রয়ন প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে রহমান আলী ও আব্দুল মজিদ নামের দুই ব্যক্তির নামে দুটি ঘর বরাদ্দ থাকলেও তাঁরা সেখানে বসবাস করেন না। আশ্রয়ন প্রকল্পের পাশের গ্রামে তারা বাড়ি করে বসবাস করছেন। দুজনের ঘরেই রয়েছে বিদ্যুতের সংযোগ। সেখান থেকে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ গছ দুরে পাশর্^বর্তী গ্রামে দেওয়া হয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২টি অবৈধ বিদ্যুতের পাশর্^ সংযোগ।

আশ্রয়ন প্রকল্পের রহমান আলী ঘর থেকে যে লাল রঙয়ের প্লাস্টিকের কভার বেস্টিত তার দিয়ে পার্শ্ববর্তী পানিমাছ-মোহনঝাড় এলাকার মো. হানিফ, নুর ইসলাম ও রহমান আলীর বাড়িতে যে বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়া হয়েছিল সেই তারটি ছিড়েই এই দূর্ঘটনা ঘটেছে। শনিবার ওই তারটিকে ঘটনাস্থলে জড়ো করে রেখেছে স্থানীয় লোকজন।

এছাড়া একই জায়গা দিয়ে বাঁশের খুঁটিতে করে সবুজ রঙের একটি তার দিয়ে আশ্রয়ন প্রকল্পের আব্দুল মজিদের ঘর থেকে পাশর্^বর্তী  মনোহরদিঘী এলাকার সাত থেকে আটটি বাড়িতে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

পানিমাছ পুকুরী আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দা খোতেজা বেগম বলেন, আমার ঘরের পাশেই রহমান আলীর ঘর। তিনি সব সময় এখানে থাকেন না। মাঝে মধ্যে আসেন। তবে তার বিদ্যুতের সংযোগ থেকে পাশের গ্রামে সাইট লাইন (পাশর্^ সংযোগ) দেওয়া আছে। শনিবার রাতে সেই তারটিই ছিড়ে পড়ে ছিল। যারা সংযোগ নিয়েছে তারা সবাই মিলে বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করেন।

মোহনঝাড় এলাকার মো. তারেক বলেন, রহমান আলীর দেওয়া সংযোগের তারটি ছিড়ে এমন দূর্ঘটনা ঘটেছে। আশ্রয়ন প্রকল্প থেকে এভাবে বাঁশের খুঁটি দিয়ে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ গজ দুরে সাইট লাইন দেওয়া হয়েছে। যাদের মিটার থেকে সংযোগ দেওয়া হয়েছে তারা আশ্রয়ন প্রকল্পে ঘর নিয়ে রেখেছেন ঠিকই কিন্তু থাকেন পাশ^র্তী গ্রামের নিজের বাড়িতে।

পানিমাছ পুকুরী এলাকার নাদির হোসেন বলেন, এই অবৈধ বিদ্যুতের সংযোগের বিষয়ে আমরা বেশ কয়েকবার অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু আমাদের কথা পল্লী বিদ্যুৎ অফিস শোনেনি। বরং এখানে যারাই সংযোগ দেখতে আসেন তারাই ঘুষ খেয়ে চুপচাপ থাকেন। আজকে তাদের অবহেলার কারণেই এক সঙ্গে তিনটি প্রাণ ঝড়ে গেল। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে এই ঘটনার বিচার চাই।

মাহান পাড়া এলাকার আব্দুল খালেক ও আশরাফুল ইসলাম বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের কিছু লোকজনের সহায়তায় এভাবে বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ দিয়ে কিছু লোক আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছে আর আমাদের মত সাধারন মানুষকে বিপদে ঠেলে দিচ্ছেন। আমরা চাই এই এলাকার সব অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।

বিদুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিহত শহিদুল ইসলামের বড় ছেলে নাজিম উদ্দীন বলেন, বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে আমার বাবা ও দুই ভাই এক সঙ্গে মারা গেছেন। সেখানে বিদ্যুতের তার ছিড়ে পানিতে পড়ে ছিল। আমি চাইনা আর কোন পারিবার এভাবে ধ্বংস হোক।

এদিকে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা শুনেছি ওই এলাকার আশ্রয়ন প্রকল্প থেকে অবৈধভাবে বিদ্যুতের সংযোগ বাইরে দেওয়া হয়েছে এবং সেখান থেকেই দূর্ঘটনা ঘটেছে। 

এ বিষয়ে আমরা দাপ্তরিক ভাবে তদন্ত শুরু করেছি। এর সঙ্গে যারা জাড়িত এমনকি পল্লী বিদ্যুতেরও যদি কেউ জড়িত থাকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে কেন এসব অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এসব অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে আমরা সব সময়ই ব্যবস্থা নিয়ে থাকি, জরিমানাও করি। কিন্তু সকালে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে আসলে বিকেলেই তারা আবার সংযোগ স্থাপন করে।

পঞ্চগড় অতিরিক্তি জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এহেতেশাম রেজা বলেন, এ ঘটনায় শনিবার রাতেই অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসক বরাবরে দাখিল করতে বলা হয়েছে। এছাড়া শনিবার রাতেই ক্ষতিগ্রস্ত ওই পরিবারটিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে শনিবার বিকেলে পল্লী বিদ্যুতের পাশর্^ সংযোগ দেওয়া রহমান আলীর পানিমাছ এলাকার বাড়িতে গিয়ে তাদের পরিবারের কাউকেই পাওয়া যায়নি। এমনকি এঘটনার পর থেকে তারা কেউই বাড়িতে নেই বলে প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দিকে সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের পানিমাছ পুকুরী-মাহানপাড়া এলাকায় বাড়ির পাশের জলাশয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শহিদুল ইসলাম (৬০) তার মেজো ছেলে নাজিরুল ইসলাম (৩০), ছোট ছেলে আসাদুর রহমান (২১) নিহত হন। ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মাহান পাড়া এলাকার শহিদুল ইসলামের মেজো ছেলে নাজিরুল ইসলাম জাল নিয়ে বাড়ির পাশের জলাশয়ে মাছ ধরতে যায়। এরপর প্রায় এক ঘন্টা ধরে তিনি ফিরে না আসায় তাঁর বাবা শহিদুল ইসলাম ও ছোট ভাই আসাদুর রহমান তাকে খুঁজতে গিয়ে ওই জলাশয়ের পানিতে নামেন। পরে তাদের তিনজনের পেছনে পেছনে গিয়ে শহিদুলের নাতী (বড় ছেলে নাজিম উদ্দীনের ছেলে) মো. মামুন (১৪) জলাশয়ের মধ্যে তাদের তিনজনকে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করেন। তার চিৎকারে স্থানীয় লোকজন ছুটে এসে দেখেন পাশের আশ্রয়ন প্রকল্প থেকে টেনে নেওয়া পার্শ্ববর্তী কয়েকটি বাড়ির পল্লী বিদ্যুতের সংযোগের একটি তার ছিড়ে পানিতে পড়ে আছে। সেখানেই বিদ্যুতায়িত হয়ে তারা তিনজনই ছটফট করছিল। পরে স্থানীয়রা বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ করে দিয়ে তাদের উদ্ধার করে পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের তিনজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। 

এ ঘটনায় শনিবার রাতেই পঞ্চগড় সদর থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়ের হয়েছে। হাসপাতালে আনার পর তিনজনকেই মৃত অবস্থায় পেয়েছিলেন বলে জানান, পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা মঈন খন্দকার।

এইচআইএইচ/এইচএস


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60, Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft