For English Version
সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৯
হোম অনলাইন স্পেশাল

কয়লার কারখানায় বিবর্ণ গ্রাম, হুমকীর মুখে পরিবেশ

Published : Saturday, 13 July, 2019 at 3:44 PM Count : 132
ফয়সাল আহমেদ

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের তালতলি গ্রাম। কৃষি নির্ভর এই গ্রামে প্রায় হাজারো মানুষের বসবাস। অধিকাংশ পরিবারই মূলত এখানে কৃষি কাজের ওপর নির্ভর করে জীবন ও জীবিকা পরিচালিত করে থাকেন। কারণ শিল্প অঞ্চলখ্যাত হওয়ার পরও আশপাশে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকায় এখনও শিল্প বিকাশমান হয়নি এই গাঁয়ে।

আবহমানকাল থেকে এই গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ এতই মনোমোহন ছিল সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করার পর ক্লান্ত হয়ে কৃষাণ ও কৃষাণী যখন ঘুমিয়ে পড়ত, পরদিনের ব্যস্ততার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য রাতের ঘুম ভাঙ্গানোর দায়িত্বে ছিল বন্য পাখিরা। আশপাশে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকায় বনের পাশাপাশি এই গাঁয়ের গাছগাছালিতে অভয়ারণ্য ছিল বিভিন্ন দেশীয় পাখিদের। কিন্তু হঠাৎ যেন গাঁয়ে কি হয়ে গেল, গত ছ'মাস ধরে এখন আর নেই পাখিদের গান, থেমে গেছে কিচির মিচির শব্দ। অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে, কোন পাখিদের উড়তেও দেখা যায়না।

গাঁয়ের এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণ খুঁজতে গিয়ে অল্পতেই বেরিয়ে এলো প্রকৃত রহস্য। গত ছয় মাস আগে স্বল্প আয়তনের এই গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে দুটি বিশালাকার কয়লা তৈরীর কারখানা। যেখানে বনের কাঠ পুড়িয়ে তৈরী করা হচ্ছে কয়লা। রাত দিন সমান করে এসব কারখানায় জ্বলছে কয়লার চুল্লিগুলো। এসব চুল্লি থেকেই অনবরত বের হচ্ছে ধোঁয়া, আর তা ছড়িয়ে পড়ছে পুরো গ্রাম জুড়েই। উন্মুক্ত পরিবেশে কাঠ পোড়ানোর কারণেই মূলত ধীরে ধীরে বিবর্ণ হয়ে পড়ছে গ্রামটি।

গ্রামের মানুষের ভাষ্য, মায়ায় জড়ানো তাদের এই গ্রাম এখন পরিণত হয়েছে ধোঁয়ার গ্রামে। গ্রামের কয়েক কৃষকের জমি ভাড়া নিয়ে স্থানীয় নুরুল ইসলাম, আবুল হোসেন ও জয়নাল মিয়া নামের তিন ব্যক্তি গ্রামে গড়ে তোলেন কয়লা তৈরীর দুটি কারখানা। দুটি উন্মুক্ত স্থানে প্রায় ২০টি মাটি দিয়ে বিশেষ ধরনের চুল্লি তৈরী তাতে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। গত কয়েকদিনেই এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে পরিবেশের ওপর। তবে পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা ভেবে স্থানীয় প্রশাসন তা স্থাপনের কয়েকদিনের মধ্যেই এসব চুল্লীগুলো গুড়িয়ে দিলেও রহস্যজনক ভাবে ফের তা চালু হয়।

গ্রামেরই এক সাধারণ কৃষক নিজাম উদ্দিন। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে জানান, একটি সময় ছিল যখন আমাদের ঘরে দখিন দোয়ারে বিশুদ্ধ বাতাশ প্রবেশ করতো। আর  কয়লার কারখানার কারণে এখন আসে ধোঁয়া। আকাশের দিকে তাকালেই দেখা যায় ধোঁয়ার কুন্ডলী, ধোঁয়ার কারণে এখন আর ঘরের দরজা, জানালা খোলা যায় না। এই ধোঁয়ার কারণে সবচেয়ে বেশী কষ্ট হয় বৃদ্ধ ও শিশুদের।

স্থানীয় আব্দুল কাদিরের (লাল মিয়া) ভাষ্য, কয়লা ব্যবসায়ীরা আগে স্থানীয় ভাবে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরী করলেও লাভবান হওয়ায় পরে তারা গড়ে তোলেন কারখানা। রাতের অন্ধকারে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ এনে এসব কারখানায় সরবরাহ করে একটি চক্র। এতে যেমন বনের গাছপালা ধ্বংস হচ্ছে তেমন ভাবে উন্মুক্ত স্থানে কাঠ পোড়ানোর কারণে স্থানীয় পরিবেশও বিষাক্ত হয়ে উঠছে। গাছপালাগুলোও মরে যাচ্ছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাশে এভাবে কয়লা তৈরীর কারখানা গড়ে তোলা আসলে বন ধ্বংসেরই নামান্তর।

অভিযোগের বিষয়ে কারখানার মালিক জয়নালের ভাষ্য, আমাদের এসব কারখানার জন্য সরকারি অনুমতির কোন প্রয়োজন নেই। আর পরিবেশেরও ক্ষতি হয় না। তবে সৃষ্ট ধোঁয়ার কারণে সাধারণ মানুষের একটু সমস্যা হয়।

তেলিহাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বাতেন সরকার জানান, এভাবে স্থানীয় পরিবেশের কথা না ভেবে অবৈধভাবে কয়লার কারখানা গড়ে উঠায় বিবর্ণ হয়ে পড়ছে পুরো গ্রাম। এতে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতির পাশাপাশি বসবাসরত মানুষেরও ক্ষতি হচ্ছে। জরুরী ভিত্তিতে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

শ্রীপুর উপজেলা ফরেষ্ট রেঞ্জার আনিসুল হকের ভাষ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাশে এভাবে কয়লা তৈরী কারখানার কারণে পরিবেশের ওপর বিরুপ প্রতিক্রিয়া তৈরী হয়েছে। উন্মুক্ত স্থানে কাঠ পোড়ানোয় জীব বৈচিত্রেরও অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। ইতিপূর্বে অভিযান করে এসব কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ফের যদি চালু হয়ে থাকে তবে আবারও অভিযান চালানো হবে।

এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুল আরেফিন জানান, আমি সদ্য এ উপজেলায় যোগদান করেছি। তাই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণা কর্মকর্তা আশরাফ উদ্দিন জানান, উন্মুক্ত স্থানে কাঠ পোড়ানোর কারণে বাতাসে কার্বনের পরিমাণ বেড়ে যায়, সঙ্গে সৃষ্ট ধোঁয়ার কারণেও প্রাণীদেহের ক্ষতি হয়। এছাড়াও জীব বৈচিত্রও হুমকীর মুখে পরে। পরিবেশের হুমকী হিসেবে গড়ে উঠা এসব কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

-এমএ


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60, Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft