For English Version
বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৯
হোম অনলাইন স্পেশাল

যেভাবে গড়ে ওঠে নয়ন-রিফাতের `০০৭' গ্রুপ

Published : Saturday, 29 June, 2019 at 10:03 PM Count : 329
মোঃ মালেক মিঠু

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যার মূল আসামীরা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ডে টনক নড়ে খোদ রাষ্ট্রযন্ত্রের। হত্যার দৃশ্যের ৪৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশব্যাপি নিন্দার ঝড় ওঠে। কিন্ত ঘটনার তিন দিন পেরুলেও এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে মুল ঘাতক নয়ন ও রিফাত ফরাজী। ঘটনা সংগঠিত করতে এরা গড়ে তোলে ০০৭ নামের একটি বাহীনি। দিনব্যাপী অনুসন্ধানে বেশ কিছু তথ্য মেলে এই বাহীনি ও হত্যা পরবর্তি আত্মগোপন নিয়ে।
   
কিলিং মিশন শেষে কোথায় গিয়েছিল খুনিরা:

অনুসন্ধানে জানা যায়, পুর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী নয়ন বন্ডের ০০৭ গ্রুপ ঘটনার দিন সকাল নয়টার দিকে বরগুনার কলেজ সড়কে অবস্থান। কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রিফাত শরীফের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। সকাল ১০.২০ মিনিটে কলেজ গেট পাড় হবার সাথে সাথে রিফাত শরীফকে ঘিরে ধরে বন্ড গ্রুপের ১০/১২ জন। কিল ঘুষি লাথি দিতে দিতে নিয়ে আসে সামনে অপেক্ষমান বস নয়ন বন্ড ও তাঁর সেকেন্ড ইন কমান্ড রিফাত ফরায়েজীর কাছে। শুরুটা করে রিফাতই। হাতে থাকা ধারালো দা’ দিয়ে কোপ শুরু করে নয়নও। রিফাত শরীফের স্ত্রী মিন্নি শুরু থেকেই আক্রমনকারীদের সাথে ধস্তাধস্তি করে কোপের মুখে নিজের স্বামীকে বাঁচাতে ব্যর্থ চেষ্টা করেন।

মাত্র ৫০ সেকেন্ডের কিলিং মিশন। কলেজ রোড ধরে চলে যান পশ্চিম দিকে। উপজেলার দীঘির পাড় ধরে পশ্চিম দিকের সড়কে অবস্থান নেয় নয়ন ও রিফাত। বাকিরা যে যার মত সটকে পড়ে।

নয়নের মা’র ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, বেলা এগারটার দিকে নয়ন তাঁর মাকে ফোন করে। নয়নের ফোন রিসিভ করেই তার মা বলেন, এ নয়ন তুই নাকি কারে কোপাইছো। আহারে কার মায়ের কোল খালি করছো। বিপরীত দিক থেকে নয়ন বলে, কোপাইছি ঠিক করছি, তুমি আমার জামা কাপড় দাও আর টাকা জোগার কর। এ কথা বলেই লাইন কেটে দেয়। পশ্চিম কলেজ সড়কের বাসার কাছকাছি লামিয়া টেইলরিং হাউজ নামের একটি দোকানের পেছনে আসে। সেখান থেকে একটি ছেলেকে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। নয়নের মা ওই ছেলের কাছে একটি টি শার্ট ও প্যান্ট পাঠিয়ে দেয়। পরে আবারও নয়ন তার মাকে ফোন করে টাকা পাঠাতে বলে। এবার নয়নের মা নিজে গিয়ে ২০ হাজার টাকা দিয়ে আসেন।
 
টি শার্ট ও প্যান্ট ও টাকা নিয়ে কেজিস্কুল সড়কে মৃত সত্তার মোল্লার ছেলে রিয়াজুলের বাড়িতে গিয়ে রিয়াজুলের সাথে দেখা করে। পরে রিয়াজুল আল আমিন  ঘাতক নয়ন ও রিফাত এ চারজন রাস্তার পাশে দাড়িয়ে কথা বলে। এসময় নয়ন একটি মুঠোফোন ভেঙে ফেলতে চাইলে রিয়াজুল ও আল আমিন ফোনটি রেখে টাকা দিয়ে দেয়। সেখান থেকে উভয়ে চলে যায়। এরপর নয়ন ও রিফাতের ক্রোক এলাকার মিন্টুর দোকান থেকে সোজা রাস্তা ধরে পশ্চিম দিকে খবীর মোল্লাদের পেছনের সড়ক হয়ে রিফাতের বন্ধু ক্রোক এলাকার আফসার উদ্দীন হাওলাদারে বাড়ির সামনে যায়। রিফাতের বন্ধু ক্রোক এলাকার মোস্তফার ছেলে সাইফুলের সাথে দেখা করে। তিনজন মিলে কিছুক্ষন কথোপকথনের পর আর তাদের দেখা পাওয়া যায়নি।

নয়নের আদ্যোপান্ত: এলাকায় পরিচিত নয়ন নামে। তবে ভালো নাম সাব্বির আহমেদ। বরগুনা সরকারি কলেজের পেছনেই একটি সেমি পাকা ঘরে মাকে নিয়ে থাকেন নয়ন। বাসার তিনটি রুমের দুটিতেও তার দখলদারিত্ব। বাড়িতে ওয়াফাই সংযোগ, ইন্টারনেট ও সিসিটিভি ক্যামেরায় যুক্ত ছিল সিঙ্গাপুর প্রবাসী বড় ভাই মিরাজের পাঠানো ল্যাপটপ। ব্যক্তিগত কক্ষেই বন্ড ০০৭ গ্রুপের আড্ডা। চলত মাদক সেবন ও বিক্রি থেকে শুরু করে সব কার্যক্রমের কার্যালয় ছিল তাঁর বাসার ব্যক্তিগত কক্ষ। মা সাহিদা বেগমকে সহ্য করতে হত ছেলের হেন কর্মকান্ড। আর এতে নিষেধ করলে তাঁকেও মারধর করত নয়ন। এই কক্ষ থেকেই ২০১৭ সালে বিপুল পরিমাণ মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।

নয়নের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিকী বেশ কয়েক বছর আগে মারা যান। তাঁর একমাত্র বড় ভাই সিঙ্গাপুরপ্রবাসী। মূলত প্রবাসী ভাইয়ের আয়েই চলে সংসার। ২০১১ সালে বরগুনা জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পাসের পর শহরের আইডিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করলেও বরগুনা সরকারি কলেজের স্নাতক শ্রেণির ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রতিদিন নিয়ম করে কলেজে যেতেন।

কলেজের অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ বলেন, নয়ন আমাদের কলেজের কোনো শ্রেণিতেই অধ্যয়নরত ছিলোনা।

২০১৫ সালে কেজিস্কুল এলাকায় বকেয়া না দেয়ায় এক দোকনকে মারধর করে আলোচনায় আসে নয়ন।  ‘নয়ন বন্ড’ নামে নিজের পরিচয় দেওয়া শুরু করেন। বন্ধু মহল থেকে শেষতক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপরাধীর তালিকাতেও তিনি বনে যান নয়ন বন্ড।

গড়ে তুলেছিলেন জেমস বন্ডের এজেন্ট নম্বর ধরে ‘০০৭’ নামে ফেসবুক গ্রুপ। ০০৭ গ্রুপের সদস্যরাও এলাকায় বখাটে হিসেবেই পরিচিত, যার কারণে কেউ টুঁ শব্দটি না করেই এত দিন ধরে তাঁর সব গুন্ডামি সহ্য করে গেছেন।

শহরের ধানসিঁড়ি এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, মাদক সেবনের টাকার জন্য কয়েক বছর আগে ছিঁচকে চুরি, মুঠোফোন ছিনতাই, ছোটখাটো চাঁদাবাজি শুরু করেন নয়ন। সন্ত্রাসীপনায় অতিষ্ঠ হলেও মুখ খুলতো কেউ। মাদকসহ বিভিন্ন মামলায় একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়ে আবার ফিরেছেন এলাকায়। তবে তাঁর সব কর্মকাণ্ড ছিল সরকারি কলেজকেন্দ্রিক। কলেজের নীরিহ ছাত্রদের মারধর করে মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে অর্থ আদায় করাই ছিল তাঁর কাজ। পরবর্তিতে গ্রুপ তৈরী করে  মাদকের বাণিজ্যে জড়িয়ে যায় সে। আর গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড রিফাতের নেতৃত্বে চলে বাকি কাজ। ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে প্রতিপক্ষকে মারধর, মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের সাথে নয়নের প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। বাকি কাজে সে নেপথ্যে থেকে রিফাতকে সহযোগীতা করত।

০০৭ গ্রু ও সেকেন্ড ইন কমান্ড হয় রিফাত ফরাজি
শহরের ধানসীঁড়ি সড়কে দুলাল ফরাজীর ছেলে রিফাত। লেখাপড়ার বিষয়ে সু নির্দিষ্ট কোনো তথ্য না থাকলেও মুলত ছিচকে গুন্ডামী দিয়ে তার উত্থান। ২০১৭ সালে ধানসীঁড়ি এলাকার অগ্রণী ব্যংকের ফিল্ড সুপার ভাই আনসার মিয়ার ছেলে তারিকের সাথে কুকুরে বাচ্চা নিয়ে বিরোধীতায় ভাগ্নেকে নিয়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে কুপিয়ে যখম করে আলোচনায় আসে রিফাত ও তার ছোটো ভাই রিশান ফরাজী। একই সালে একই এলাকার বড় ভাই নয়ন বন্ডের একই কর্মকান্ডের জন্য সখ্যতা গড়ে ওঠে। রিফাতের কিছু অনুসারীও তৈরী হয় ইতোমধ্যে। রিফাত ও নয়নের সাথে তাঁদের অনুসারী মাদক সেবনে অভ্যস্ত কিছু তরুণ মিলে নয়ন বন্ডের নেতৃত্বে গড়ে তোলে জেমস বন্ডের আদলে ০০৭ গ্রু।

এই গ্রুপটি পরষ্পর যোগাযোগের জন্য ফেসবুকেও ০০৭ নামের একটি গ্রুপ তৈরী করে। গ্রুপ লিডার হয় নয়ন বন্ড এবং সেকেন্ড ইন কমান্ডের দায়িত্ব পালন করেন রিফাত। এই গ্রুপের অনেকেই মোটরসাইকেলে ০০৭ সংকেত ব্যবহার করত। গ্রুপটির নিয়মতি কাজ ছিল বরগুনা পলিটেকনিকের ছাত্রদের ছাত্রাবাসে হানা দিয়ে মুঠোফোন ও ল্যাপটপ জিম্মি করে টাকা আদায় করা। কেজিস্কুল এলাকার প্রায় সবগুলো ম্যাচের শিক্ষার্থীদের মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে অর্থ আদায় করেছে এই রিফাত ও তার বাহিনী।

ম্যাচ মালিক মোয়াজ্জেম হোসেন লাবু, আজীম মোল্লা, কালাম মোল্লা, বাদল মিয়াসহ বেশ কয়েকজন জানান, রিফাত প্রতিনিয়তই ম্যাচে হানা দিয়ে ছাত্রদের ফোন ল্যাপটপ জিম্মি করে টাকা আদায় করত।

ছেলের অধপতনে বাবার আষ্কারা
বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর সোনাতলা এলাকার মৃত হাফেজ ফরাজীর ছেলে দুলাল ফরাজী। পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত সামান্য কৃষি জমিই তার আয়ের মুল উৎস। দুই যুগ আগে বরগুনা পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের ধানসীড়ি সড়কে জমি কিনে ঘর নির্মাণ করেন। প্রথমে কাঠের ঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস করলেও সম্প্রতি সেমিপাকা বাড়ি নির্মাণ করেণ। রিফাত শরীফ হত্যার প্রধান আসামীদের অন্যতম তারই দুই ছেলে রিফাত ও রিশান। বরগুনা শহরের বাসাই বেড়ে ওঠা রিফাত ও রিশানের। দুই ছেলের কর্মকান্ড নিয়ে কখনোই তিনি বিব্রত ছিলেন না। এমনকি নালিশ পেলে অনেকটা গর্বিতই মনে করতেন বলে এলাকাবাসীর অভিমত।

ছেলেদের অপরাধ কর্মকান্ডকে প্রশ্রয়ই দিয়েছেন তিনি। কেউ বাবার দুলালের কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলে তিনি ছেলেদের নির্দোষ দাবী করে সাফাই গাইতেন। এমনকি নেপথ্যে ছেলেদের ক্ষেপিয়ে তুলতেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়।

৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জহিরুল হক নান্না বলেন, লাবুর ম্যাচের ছেলেদের মোবাইল নেয়ার পর আমি রিফাতের বাবাকে ডেকে পাঠাই। দুলাল ফরাজী ছেলেকে নিয়ে আসার পর বাবার সামনেই রিফাত আমাকে রামদা দিয়ে ধাওয়া দেয়ার চেষ্টা করে। তখন দুলাল নির্বিকার থেকে ছেলেদের নিয়ে চলে যান, ম্যাচে ছাত্রদের হয়রানীর ঘটনায় নালিশ করলে উল্টো দুলাল ফরাজী ছেলেদের ক্ষেপিয়ে তুলতেন। ছেলেদের এমন সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার পেছনে বাবা দুলালের বেশ ভূমিকা রয়েছে বলেও জানা কাউন্সিলর নান্না।

তবে কখনোই এদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। কারন, মামলা বা অভিযোগ তো দূরে থাক, কেউ এদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতেই সাহস পায়নি। যে মুখ খুলেছে তাকেই লাঞ্চিত হতে হয়েছে। তবে মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে বরগুনা থানায় রিফাতের বিরুদ্ধে চারটি ও নয়নের বিরুদ্ধে আটটি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় আটক হলেও রাতারাতি জামিনে এসে ফের একই কাজে লিপ্ত ছিল এই বাহিনী।

তিনদিনেও গ্রেফতার না হওয়া প্রসঙ্গে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, আমরা বসে নেই, জালের ফাঁস ছোট হয়ে আসছে, আইনের ফাঁক গলে কেউ বাঁচতে পারবেনা। আসামীদের পালানোর সব পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।





তিনি বলেন, আরও দু তিনদিন সময় লাগতে পারে। তিনি সবার সহযোগীতা কামনা করে বলেন, এমন ঘটনায় অপরাধীদের গ্রেফতারে আমরা সবার সহযোগীতা কামনা করছি।

এসআর


« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60, Advertisemnet: 9513663
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected], [email protected],   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft